জলঢুপী কমলা হৃদয়ে আছে বাজারে নেই

KMLমিলাদ জয়নুল : বিশ্বব্যাপী সমাদৃত বিয়ানীবাজারের ঐতিহ্যবাহী জলঢুপী কমলা এখন আর কোথাও পাওয়া যায়না। শুধু প্রবীণ ব্যক্তিরাই জলঢুপী কমলা’র স্মৃতি আওড়ান আর উত্তরসূরীদের কাছে সুস্বাদু এই পরিচিত ফলের নানাকথা তুলে ধরেন। দেশবাসী এই ফল সম্পর্কে অবগত থাকলেও বাজারে এর দেখা পাওয়া সত্যিই কঠিন। কমলার মৌসুম আসে আবার চলেও যায়, তবে রসালো এই ফলের দেখা পাওয়া যায়না।

অথচ নিকট অতীতে জলঢুপী কমলা উপহার দেয়া হতো প্রিয়জনদের। এখন চড়াদামে জলঢুপী কমলার নামে ক্রেতারা কিনে নিচ্ছেন ভারতীয় কমলা। কাঁচাপাকা এই কমলা দেখতে দেশী মনে হলেও স্বাদ ভিনদেশী।

মূলত বিয়ানীবাজার উপজেলার ছোট ছোট টিলা অধ্যুষিত অঞ্চল জলঢুপ এলাকায় অধিক মিষ্টি এই কমলার ফলন হতো বলে এলাকার নামে এ ফলের নামকরণ হয়। পরবর্তীতে জলঢুপী কমলা এলাকা তথা দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হয়। বর্তমানে দেশবাসী এ ফলের নাম ঝপলেও কোথাও এর দেখা পাওয়া যায়না।

সঠিক পরিকল্পনা, পৃষ্ঠপোষকতা, পরিচর্যা ও কৃষকদের যথোপযুক্ত প্রশিক্ষণের অভাবে এখানকার কমলা চাষ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এক সময় বৃহত্তর সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, ছাতক, বড়লেখা, মাধবপুর, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, ও শ্রীমঙ্গল উপজেলার টিলা সমৃদ্ধ অঞ্চলে এক সময় প্রচুর কমলার চাষ হত। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কমলা এই এলাকার চাহিদা পূরণ করে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি হত। তখন কমলাই এই অঞ্চলের চাষীদের প্রধান অর্থকরী ফসল ছিল।
কৃষি গবেষণার সাথে সংশি¬ষ্ট সূত্র জানায়, ষাটের দশকে এই অঞ্চলের কমলা ক্ষেতে ব্যপক মড়ক দেখা দেয়। মড়কে অধিকাংশ কমলা বাগান নষ্ট হয়ে যায়। বড় ধরনের এই ক্ষতি পোষাতে না পেরে অনেক চাষীই কমলা চাষের উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। সূত্র আরও জানায়, বৃহত্তর সিলেটের বেশিরভাগ টিলা সমৃদ্ধ অঞ্চলে কমলা উৎপাদনের যে পরিবেশ দরকার তার সবই আছে।

শুধু প্রক্রিয়ার অভাবে এই অঞ্চলে কমলা চাষ পিছিয়ে পড়েছে। বর্তমানে বিয়ানীবাজার উপজেলার পাড়িয়াবহর, জলঢুপ, বড়লেখা উপজেলার বড়ইল, গল¬াসাঙ্গন এবং গুলশা এলাকার প্রত্যেক বাড়িতে কমবেশি কিছু কিছু কমলার গাছ লাগানো হয়েছে। এ থেকে যা উৎপাদিত হয় তাতে পরিবারের লোকজনের চাহিদা পূরণের পর কিছু কমলা বাজারজাত করা হয়।

অথচ এক সময় সিলেটের জলঢুপী কমলার দেশব্যাপী জনপ্রিয়তা ছিল। সুস্বাদু এই কমলা বিদেশেও রপ্তানি করা হত। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেইসব এখন শুধুই স্মৃতি। গল¬াসাঙ্গন গ্রামের কমলা চাষী ইব্রাহিম আলীর সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, কমলা চাষ করে আশানুরূপ ফলন পাওয়া যাচ্ছে না। গাছে কমলার ফলন আশার পর তা পরিপক্ক হওয়ার আগেই গান্ধি পোকার আক্রমণ দেখা দেয়। ফলে পাকার আগেই কমলার গাছ থেকে ঝড়ে পড়ে। এ কারণে কমলা চাষ করে লাভের পরিবর্ততে লোকসান হচ্ছে।

জলঢুপ এলাকার কমলা চাষী নিটোল ভট্রাচার্য বিয়ানীবাজারকন্ঠকে জানান, জলঢুপসহ আশেপাশের এলাকায় কমলা উৎপাদনের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এখানকার কমলা খুবই মিষ্টি হয়। তিনি প্রায় ১০ একর জমি জুড়ে একটি ফল বাগান প্রকল্প করেছেন। তার বাড়িতে প্রায় ১৫০টি কমলা গাছে প্রতি বছর ৫০ হাজার ফলন আসে।

তার ভাই বিঞ্ষুপদ ভট্টাচার্য্য আরেকটি কমলা বাগান প্রকল্প করে দেশে অনেক খ্যাতি অর্জন করেছেন। তিনি কমলা চাষে সফল কৃষক হিসাবে জাতীয় পর্যায়ে ‘বঙ্গবন্ধু কৃষি সনদ’ লাভ করেন। প্রতি বছর কমলা বাগান থেকে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা আয় করেন বলে বিষ্ণুপদ জানান। ১৯৯৭ সালের এপ্রিল মাসে মেঘনা নামক ভ্রাম্যমান মৃত্তিকা গবেষণাগারের বৈজ্ঞানিকরা সিলেটের মাটির ওপর ব্যাপক পরীক্ষা চালান। একটি রিপোর্টে তারা উলে¬খ করেন, বিশেষ করে কমলা চাষের জন্য টিলা সমৃদ্ধ মাটিতে রাসায়নিক পদার্থের অভাব রয়েছে। যে কারণে সিলেটে কমলার চাষ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে তাদের মতে, যথারীতি মাটিতে সার প্রয়োগ করে গাছের সঠিক পরিচর্যা ও রোগবালাই চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে কমলা চাষ করে লাভবান হওয়া সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মৌসুমের শুরুতেই এই এলাকার কমলা পরিপক্ক হয়। কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করে এই অঞ্চলে কমলা উৎপাদন শুরু করা হলে সিলেটের কমলা থেকে দেশের অনেকটা চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে। কৃষকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, কষ্ট করে চাষাবাদ করে এখানকার কমলার সুষ্ঠু বিপণন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে সঠিক মূল্য পাওয়া যায় না। তাছাড়া নানা রকম রোগবালাই, খরা, ঝড়, বৃষ্টি ইত্যাদির কারণে আশানুরূপ ফল না পেয়ে অনেক কৃষকই উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছেন।

বিয়ানীবাজারের টিলা শ্রেণীর সর্বোচ্চ উচ্চতা ৩০ দশমিক ৩ মিটার। বি¯ৃ—ত টিলা শ্রেণীর পরিমাণ প্রায় ৫১ দশমিক ৮ বর্গকিলোমিটার। এসব টিলা ভূমির বেশিরভাগই পতিত হিসেবে পড়ে আছে।

বিয়ানীবাজার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা পরেশ চন্দ্র দাস বিয়ানীবাজারকন্ঠকে জানান, স্থানীয় লোকদের উদ্বুদ্ধ করে এসব জমিতে কমলা চাষ করা হলে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাবে।