বিয়ানীবাজারে ১৭ সদস্যের শান্তি কমিটির নেতৃত্বে চলে নির্যাতন

রাজারদের একাংশ
শান্তি কমিটির একাংশ

মিলাদ জয়নুল :  বিয়ানীবাজারে একাত্তর সালে সংগঠিত হত্যা, নারী ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাটের প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে নেতৃত্বদানকারী যুদ্ধাপরাধী মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের সাথে জড়িত রাজাকার, আলবদর, আল সামছ শান্তি কমিটির সদস্যদের তালিকা তৈরীর কাজ শুরু করেছে প্রশাসন। পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনও মাঠে নেমেছে তালিকা তৈরীর কাজে। কিন্তু পুলিশ, উপজেলা প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনদের একাত্তরের ঘাতক, ধর্ষণকারী ও অগ্নিসংযোগ লুটপাটকারীদের সহযোগীদের নাম পরিচয় দিতে অনেকেই নারাজ। তালিকা তৈরীর কাজে কেউ সহযোগিতা না করাতে বিপাকে পড়েছে প্রশাসন।

 

 

উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধ মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের সাথে জড়িতদের কোন তালিকা প্রশাসনকে দিতে পারেনি। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগের অভ্যন্তরে থাকা দায়িত্বশীলদের অনেকে একাত্তর সালে জামায়াতে ইসলামী ও মুসলিম লীগের হয়ে রাজাকার ছিলেন। এ কারণে স্রোতে গা ভাসিয়ে দায় সারছেন আওয়ামীলীগের অনেক নেতা। একাত্তর সালে যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা, খুন, নারী ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের সাথে যুক্ত সশস্ত্র পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ও নিরস্ত্র বেসামরিক দালাল। এদের তত্ত্বাবধানে গড়ে উঠা রাজাকার আলবদর, আল-সামছ বাহিনী ও শান্তি কমিটি মজলিশে শূরা সদস্যদের দ্বারা হিংস্রতার স্বীকার নির্যাতিত ক্ষতিগ্রস্থ পরিবার, ব্যক্তি ও মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শীদের সাথে কথা বলে সাপ্তাহিক আগামী প্রজন্ম’র অনুসন্ধানে উঠে আসছে রাজাকারদের অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য।

 

মুসলিমলীগ, জামায়াতে ইসলামীর সদস্যরা রাজাকার, আলবদর দ্বারা বিয়ানীবাজারে গঠিত হয় ১৭ সদস্যের মজলিশে সূরা শান্তি কমিটি। এ কমিটির সদস্যদের সহযোগিতায় মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বিয়ানীবাজারে ২৫টি পরিবার গণহত্যার শিকার হয়। স্থানীয় রাজাকারদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় পরিকল্পিতভাবে ধরে এনে শতাধিক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছিল। এসব হত্যাকান্ডের জন্য মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময় বিয়ানীবাজার থানায় ২০টিরও বেশি মামলা দায়ের হয়। এসব মামলার বাদী ছিলেন নিহত ও ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের সদস্যরা। এর পাশাপাশি সরকার বাদী হয়ে দালাল আইনে শতাধিক মামলা দায়ের করে। এসব মামলায় সেই সময় অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছিল। কিন্তু ওইসব মামলা নথিপত্র ও রেজিস্ট্রার খুঁজে পাচ্ছেনা প্রশাসন। মুক্তিযোদ্ধের প্রথম প্রহরে ২৫শে মার্চ কালো রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের সামনে খুন হন বিয়ানীবাজারের সন্তান বাঙালি দার্শনিক ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব (জি.সি দেব)।

 

একাত্তরের ১৭ এপ্রিল পাকিস্তানের বেলুচ রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন গন্দোলের নেতৃত্বে বিয়ানীবাজার থানা সদরে ডাক বাংলোতে পাকহানাদার বাহিনী ক্যাম্প স্থাপন করেন। এখানে বসেই তারা রাজাকার, শান্তি কমিটির সদস্যদের দিয়ে তাদের নীল নকশা অপকর্ম বাস্তবায়ন করতে থাকে। রাজাকাররা আওয়ামীলীগের নেতাকর্মী মুক্তিযোদ্ধার বাড়ীঘর দেখিয়ে দিত পাকসেনাদের। রাজাকারদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে লোকজনদের ধরে নিয়ে হত্যা করা হত। রাজাকারদের সহযোগিতায় খুন ধর্ষণের পাশাপাশি উপজেলার শতাধিক বাড়িতে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে।
শুধুমাত্র পুরুষ নয় অনেক নারীও রাজাকার ছিল। তারা ঘাতকদের আমোদফূর্তির জন্য এলাকার যুবতী ও নারীদেরকে তাদের হাতে তুলে দিত। লোকলজ্জার ভয়ে এখনও অনেকে মুখ না খুললেও রাজাকার ঘাতকদের বিচার চান অনেকেই। বৃদ্ধ, ছাত্র, যুবক, নারী, শিশু প্রতিবন্ধী মিলে বিয়ানীবাজারে দু’শতাধিক ব্যক্তি হত্যার শিকার হন।

 

পাকবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের সহযোগিতায় চারখাই জালালনগরের বৃদ্ধ ইয়াজ উদ্দিনকে তার বাড়ীতে হত্যা করা হয়। হত্যার পর তার বাড়িতে ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। ইয়াজ উদ্দিন হত্যাকান্ডের ঘটনায় স্বাধীনতার পর স্থানীয় জামায়াত নেতা মহিউল ইসলাম চৌধুরী ও রাজাকার কমান্ডার সফিক আহমদের নাম উল্লেখসহ ৩৪ জনকে আসামী করে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। এর বাদী ছিল সরকার। নিহতের পুত্র আহমদ আলী পাখি বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে পিতৃহত্যার বিচার চেয়ে আবেদন করেন। আবেদনে তিনি মামলাটি পুনরিজ্জীবিত করার দাবি জানান। একইভাবে বিয়ানীবাজার জুড়ে রাজাকার, আলবদর, আল-সামছ শান্তি কমিটির সদস্য জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগের পরিকল্পনা ও সহযোগিতায় ঘাতকদের হাতে খুন হন নয়াদুবাগ গ্রামের আছাব আলী।

 

এ খুনের ঘটনায় নিহতের ভাই আতাউর রহমান বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। মামলায় পাকিস্তানী ক্যাপ্টেন সমশের, স্থানীয় রাজাকার মছদ্দর আলী, আরব আলী, মুকুল মিয়া, ফেকই মিয়াকে আসামী করা হয়। জিয়াউর রহমান দালাল আইন বাতিল করলে মামলাটিও খারিজ হয়ে যায়। মাথিউরার বাসিন্দা বাউল শিল্পী কমর উদ্দিন, সুপাতলার মিছির আলী হত্যার ঘটনায় মামলা হয়। ফতেহপুর গ্রামে তাহির আলী ও তার পুত্র আবুল হোসেন নিজামকে হত্যার ঘটনায় রাজাকার ছিকন্দর আলী, সিতাই বিবি ও তার পুত্র পাকসেনা সদস্য সামছ উদ্দিনকে আসামী করা হয়। মুড়িয়া ইউনিয়নের সারপার নয়াগ্রামের বাসিন্দা মকদ্দছ আলী ময়না মিয়াকে রাজাকারদের প্ররোচনায় হত্যার অভিযোগে মামলা হয়।

 

হত্যার ইন্ধনদাতা হিসাবে আসামী করা হয় সারপার শান্তি কমিটির আহবায়ক জামায়াত নেতা ডাঃ ফজলুল করিম, মুসলিম লীগের সফিকুর রহমান সপই, মাওলানা মোজাহিদ আলী, আব্দুল ফাত্তাহ বাতাই মিয়া, হাজী সাঈদ আলী। ঐ এলাকার আব্দুর রউফ তাপাদার কুটি মিয়া ও আব্দুল মুহিত তাপাদার কনা মিয়াকে হত্যার অভিযোগে থানায় মামলা দায়ের হয় স্থানীয় রাজাকারদের আসামী করে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পর হত্যা মামলাটির অপমৃত্যু ঘটে।

 

ভারত সীমান্তঘেষা পূর্ব মুড়িয়া এলাকাটি একাত্তর সালে জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তাদের দেয়া তালিকা অনুযায়ী হত্যা করা হয় নারী, পুরুষ, শিশুসহ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যদের। ঐ এলাকার রাজাকার শান্তিকমিটির দায়িত্বে ছিলেন মাওঃ ফজলুল করিম, আব্দুস শহীদ, আব্দুল খালিক, তাহির আলী, তোয়াইদ আলী, সফিকুর রহমান, ছাদ উদ্দিনসহ অনেক। একাত্তরের ঘাতক ইয়াজ উদ্দিন হত্যা মামলার আসামী রাজাকার মহিউল ইসলাম চৌধুরী এখন জামায়াতের রোকন সদস্য।

 

তারই আপনজন ঐ সময় জামায়াতকর্মী খালেদ আহমদ ও সফিক আহমদ ছিলেন সশস্ত্র রাজাকার। চারখাই এলাকার বাসিন্দা মুক্তিবাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার মেজর (অবঃ) ফাত্তাহ চৌধুরীর বাড়িতে রাজাকারদের সহযোগিতায় পাক হানাদার বাহিনী হত্যা, হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করেন। একইভাবে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের কারণে সাবেক বিচারপতি এম.এ.হাছিব ও বর্তমান বিচারপতি আবু তারেক এর শ্রীধরা গ্রামের বাড়িতে রাজাকাররা অগ্নিসংযোগ করেন।