রক্তে ভেজা পতাকা আরো রঙ্গিন হয়, বাবা ও ভাইদের রক্তে

jaker ca                                                                               ।।  মো: জাকির হোসেন ।।

৭১’র মুক্তিযুদ্ধ কিংবা ৭৫’র ১৫ আগষ্ট নিয়ে কিছু লিখতে বসলেই চোখ ছলছল করে, হারিয়ে যাই স্মৃতির অতল গহবরে। তাই এসব নিয়ে এখন সহজে কিছু লিখতে চাইনা। কিন্তু এবার সাপ্তাহিক আগামী প্রজন্ম সম্পাদকের চাপে মুক্তিযুদ্ধকালে পাকহায়েনা কর্তৃক আমার পিতা শহীদ তাহির আলী ও বড় ভাইদের ধরে নিয়ে হত্যার বিষয়ে স্মৃতিচারণ করে লিখতে অনেকটা বাধ্য হলাম। কলেজে পড়াবস্থায় দৈনিক যুগভেরীতে কিছু লেখালেখি করতাম। এখন রাজনীতিতে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে যাওয়ার কারণে লেখালেখির পাঠ প্রায় শেষ হওয়ার পথে।

 

এবার আসি মূল প্রসঙ্গে। মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশের যে ক’টি পরিবার সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে তার মধ্যে আমাদের পরিবারও একটি। মুক্তিযুদ্ধে আমি হারিয়েছি আমার পিতা শহীদ তাহির আলী, ভাই আলতাফ হোসেন ও আরেক ভাই আবুল হোসেন নিজামকে। যতটুকু মনে পড়ে-৭১’সালের কোন একদিনে (সঠিক দিন ও বার মনে নেই) বেলা অনুমান ২টার দিকে আমাদের বাড়ীর চর্তুদিকে পাকবাহিনী ঘেরাও করে বাড়ীর ভিতরে ঢুকে পড়ে। আমি বাড়ীর রাস্তায় দাঁড়ানো ছিলাম।

 

খাকির পোষাক পরিহিত লোক দেখে ঘরে এসে মাকে জানালাম। পিছনে দাঁড়িয়ে দেখি ঘরের মধ্যে ৩-৪জন, ছোট ভাই আমজাদ হোসেন হানিফা মাঠিতে শুয়ে কান্নাকাটি করছে। পাঞ্জাবী এসে গেছে তাই বাবা ও ভাইয়েরা আর বাড়ী থাকতে পারবেন। মা’ এটা বুঝতে পেরে ঘরের ২-৩টি মুরগী জবাই করে রান্না শুরু করতে লাগলেন। রান্নাঘরে থাকাবস্থায় আমার মা পাক হায়েনাদের বুটের শব্দ শুনে বেরিয়ে আসলেও তাদের সামনে পড়ে গেলেন। একপর্যায়ে মা’ও কাঁদতে লাগলেন। মাঠিয়ে শুয়ে কাঁদছে ছোট ভাই, ভয়ে কাঁদছেন মা। তখন পাঞ্জাবীরা মা’কে ধমক দিয়ে উর্দূতে কি যেন বলার পর মা’ হানিফাকে কোলে তুলে নিলেন।

 

বসতঘরে এক দৃশ্য, ওঠানে অন্য দৃশ্য। বাইরে বেরিয়ে দেখি, ৩-৪জন পাঞ্জাবী সেনা আমার বড় ভাই মুজিব বাহিনীর সদস্য আলতাফ হোসেন (লাল মুক্তি বার্তা নং ০৫০১০২০৪৯৬) এর রুমে গিয়ে সেখানে বঙ্গবন্ধুর ছবি টানানো দেখে ক্ষুব্দ হয়ে ওঠে। পাঞ্জাবী সেনারা রাগান্বিত হয়ে উদূর্তে আমার বাবাকে বকাঝকা শুরু করলে তিনি তাদের জানালেন-ত্যাজ্য করে দিয়েছি। তখন আমার বৃদ্ধ বাবাকে এক পাঞ্জাবী হায়েনা বন্ধুকের বাট দিয়ে সজোরে পেটে আঘাত করলে বাবা পড়ে গিয়েছিলেন।

 

পরে পাঞ্জাবীরা আমার অপর ভাই আবুল হোসেন নিজামকে দেখে তাকে উর্দূতে কি যেন বলতে থাকে। নিজাম ভাইও আমাদের বাড়ীর পাশে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেন। তাই তার হাতের কনুইতে দাগ পড়ে যায়। পাকিস্তানীরা কনুইয়ের এ দাগ দেখে তাকেও মারতে থাকে। শুরু করে স্নেহময়ী বাবা ও ভাইকে বেদড়ক মারধর। আমি এবং অপর ভাইয়েরা মারধরের এই দৃশ্য শুধু দেখতে থাকি আর নীরবে চোখের জল ফেলি।

 

মারধর শেষ করে পাক সেনারা আমার বাবা তাহির আলী ও ভাই আবুল হোসেন নিজামকে চোখ বেঁধে নিয়ে যায়। আমি, মা এবং অপর ভাইয়েরা এ দৃশ্য দেখে কান্নাকাটি করছিলাম। কিছুক্ষণ পরে বন্দুকের কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দ শুনি। এই শব্দ যে আমার বাবা ও ভাইয়ের প্রাণ কেঁড়ে নিচ্ছে, তা আমরা বুঝতে পারিনি। একটু পরে আমার নানী এসে মা’সহ আমাদের জড়িয়ে ধরে জানালেন-বাবা ও ভাইকে পাক হায়েনারা মেরে ফেলেছে। নানী আরো বললেন-এসো, সবাই বাড়ী থেকে সরে পড়ি, নতুবা কাউকে হায়েনারা বাঁচতে দেবেনা।

 

তখন আমাদের কান্নার রোল আরো বেড়ে গেল। এ সময় ফের ২-৩জন পাঞ্জাবী সেনা আমাদের ঘরে প্রবেশ করে জানায়, তোমাদের ঘরে টাকা-পয়সা আছে। এগুলো দিয়ে দিলে তোদের বাবা ও ভাইকে ছেড়ে দিব। আমার মা’ সে কথা বিশ্বাস করে ট্র্যাংক থেকে টাকার থলি বের করে দিলেন। বারান্দায় তখন আমার নানী দাঁড়িয়ে থেকে হাত বাড়ালে পাঞ্জাবী সেনারা তাকে কয়েন বের করে দিল। আমি হাত বাড়ালেও আমাকে দেয়নি। আমার মনে পড়ছে-তখন পাকিস্তানীদের আমাদের বাড়ীটি চিনিয়ে দেন হায়েনাদের দোসর সিতারা বিবি, নবাংয়ের আব্দুর রহীম বছন হাজী এবং তাদের সহযোগীরা।

 

এই রাজাকাররা আমাদের পরিবারের সকল তথ্য পাকিস্তানীদের সরবরাহ করে এবং বড় ভাইয়ের ছবিও তাদের হাতে তুলে দেয়।
এরপর পাঞ্জাবী সৈন্যরা চলে গেলে আমার নানী আমাদের নিয়ে তার বাড়ীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। কিন্তু পথ থেকে ফিরে এসে পরিবারের সবাই আমার চাচার বাড়ীতে আশ্রয় নেই। সন্ধ্যার পর একটি নৌকায় করে জীবন বাঁচাতে সবাই অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ী জমাই। নৌকায় দীর্ঘপথ মাড়িয়ে আমরা আমাদের বাড়ীতে বসবাসকারী হুজুরের বাড়ী বর্ণিতে আশ্রয় নেই।

 

সেখানে অনাহারে-অর্ধাহারে আমাদের দিন কাটে। কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর আমার বড় ভাই আলতাফ হোসেন ভারত থেকে এসে আমাদের জানান-আমাদের সেখানে নিয়ে যেতে এসেছেন। আমরা সবকিছু গোছানোর পরও আমাদের না নিয়ে তিনি ফের ভারত চলে যান। তার আর কোন খবর নেই। আম্মাসহ পরিবারের সবাই ধারণা করেছিলেন-যুদ্ধক্ষেত্রে হয়তো আমার ভাই বিয়ানীবাজারবাসীর প্রিয় আলতাফ হোসেন মারা গেছেন। কিন্তু না, তিনি কিছুদিন পর ফিরে আসেন এবং আমাদের সবাইকে ভারতে নিয়ে যান। সেখানে এক আত্মীয়ের বাড়ীতে আমাদের রেখে ভাই চলে যান আবার যুদ্ধের ময়দানে। তার কোন খোঁজ নেই।

 

নিরাপত্তা এবং জীবনের প্রয়োজনে ভারতে আমরাও একাধিকবার স্থান বদল করি। সেখানে আমাদের ভরণ পোষণের জন্য বড় ভাইয়েরা মানুষের কাজ করেছেন, সয়েছেন অনেক লাঞ্চনা-গঞ্জনা। পরে অবশ্য আমাদের রেশনের ব্যবস্থা করা হয়। একদিন যুদ্ধে আহত হয়ে বড় ভাই আলতাফ হোসেন আমাদের সাথে ভারতে দেখা করেন। এক রাতের জন্য মা’ ও আমাদের দেখে গিয়ে আর ফিরেননি তিনি। আমরা শুনেছি-আগরতলায় বড় যুদ্ধ হয়েছে। আলতাফ হোসেন সে যুদ্ধে অংশ নেন। হয়তোবা সেখানেই তিনি দেশ মাতৃকার স্বাধীনতার জন্য জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন।

 

এমন অবস্থায় আমরা দেশে ফিরবো কি করে? আমার বড় ভাই উপজেলা আওয়ামীলীগের বর্তমান কোষাধ্যক্ষ ময়নুল হোসেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী জিয়াউল হোসেনসহ সবাই আমাদের চিন্তায় বিভোর। বর্তমান পৌর প্রশাসক তফজ্জুল হোসেন তখন আমাদের সহায় সম্পত্তি দেখাশুনার জন্য দেশেই অবস্থান করছিলেন। তবে জীবনের ঝুঁকি থাকায় তিনিও কোথাও এক রাতের বেশী থাকেননি। আমাদের সাজানো সংসার তছনছ হওয়ার পরও মা’ আমাদের নিয়ে দেশে ফিরলেন। দেশে ফেরার পর অনেকেই আমাদের দেখতে আসেন।

 

শুধু বাবা শহীদ তাহির আলী, বড় ভাই আলতাফ হোসেন ও আরেক ভাই আবুল হোসেন নিজাম আর ফিরে আসেননি। আর আসবেন-ই বা কি করে? এই প্রিয় জন্মভূমির বুকে লাল সবুজ পতাকা ওড়াতে জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন তারা। রক্তে ভেজা পতাকাকে লাল রঙ্গে রাঙ্গিয়ে দিয়ে বাবা ও ভাইয়েরা আছেন চিরনিদ্রায়। আর আমরা বেঁচে আছি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালন করে প্রগতিশীল আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী হিসেবে।

 

তাই মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়েও ৭৫ সালের ১৫ আগষ্টে স্ব-পরিবারে জাতির পিতাকে হত্যার কথা মনে পড়লে হৃদয়েপটে ভেসে ওঠে আমার বাবা ও ভাইয়ের মৃত্যুর কথা, সেই আতঙ্ক জাগানিয়া বুলেটের উচ্চ শব্দের কথা। তখন আর নিজেকে শান্ত রাখতে পারিনা। চোখের কোনে জল আসে, কণ্ঠ ভারী হয়ে ওঠে।