হাতের চুড়ি ভাঙ্গল মায়ের বাবাও ফিরলেন না…

                                                            sopon

।। সাঈদ আহমদ মুমিত (স্বপন)।।
সেই ভয়াবহ দিনগুলোর কথা কখনো ভুলা সম্ভব নয়। আমার বয়স তখন ৯ বছর, ক্লাস ফোরে পড়ি। ১৯৭১ সাল, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ। বাবা বাঁশী বাজাতেন। বাঁশী বাজিয়ে সহস্রাধিক মানুষকে মোহাবিষ্ট করে রাখতেন বিয়ানীবাজার পিএইচজি হাইস্কুলের খেলার মাঠে। আমার খুব মনে পড়ে বাবা শহীদ হওয়ার বছর দেড়েক আগের একটি দিনের কথা। সেদিন বিয়ানীবাজার হাইস্কুল মাঠে একটা ফুটবল ম্যাচ ছিল। ফাইনাল খেলা। সব মানুষের মুখে বাবার নাম।

 

বাবা আজকের এই ফাইনাল খেলায় বাঁশী বাজাবেন। আমার আব্দার ছিল-প্রতিদিন খেলা দেখার। সেদিন আমার আব্দার ফলপ্রসূ হল। আমার এক চাচাতো ভাইয়ের সাথে খেলা দেখতে গেলাম। মাঠের চারিদিকে লোকে লোকারণ্য। এক চাপা উত্তেজনা, কখন খেলা শুরু হবে। অবশেষে মাঠে নামলো খেলোয়াড়রা, মাঠে নামলেন রেফারীর জমকালো পোশাক পরিহিত আমার বাবা শহীদ আব্দুল মান্নান। বাঁশী বাজালেন, খেলা শুরু হয়ে গেল। সেদিনকার অনুভুতি আজ দীর্ঘ কয়েক বছর পরও আমার কাছে জীবন্ত। আমার বাবা ছিলেন ক্রীড়া ও সংস্কৃতি পাগল লোক। এসব নিয়েই তার কাজ কারবার। আমার পিতামহের ব্যবসা ছিলো ভারতের করিমগঞ্জ শহরে।

 

বাবা করিমগঞ্জ নীল মনি হাইস্কুলের ছাত্র ছিলেন এবং ছাত্রাবস্থায় খেলাধুলার প্রতি ঝোঁকে পড়েন। আমার বাবার বন্ধুদের কাছে শুনেছি তাঁর খেলোয়াড় ও রোফারী জীবনের কত কথা-কত গল্প। তৎকালীন ভারতের নাম করা ফুটবল দল কলকাতা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সাথে তার প্রত্যক্ষ সর্ম্পক ছিল। তিনি রাজনীতি পছন্দ করতেন না এবং রাজনীতির ধার ঘেঁষতেনও না। তবে দেশ ও মাটির স্বাধীনতার জন্য তার তীব্র টান ছিল।
আমার মা সৈয়দা হোসনে আরা বেগম ও ছোট দু’বোন শিল্পী ও শিখাকে নিয়ে বেশ সুন্দর ও স্বচ্ছন্দ ছিল আমার বাবার সংসার। খেলা পাগল ও প্রাণখোলা পিতার ভালোবাসা ও স্নেহে বেশ কাটছিল আমাদের জীবন। আমাদের এই সুশৃঙ্খল জীবন ধংসের এক অশনি সংকেত নিয়ে এলো ১৯৭১ সাল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ।

 

এপ্রিল মাসের প্রথম ভাগে যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার পূর্ব মুহুর্ত। আমার ফুফাতো ভাই আবুল হোসেনকে ঢাকা তেজগাঁও বিমান বন্দরে পাক সেনারা ধরে নিয়ে মেরে ফেলে। তাঁর সহোদর বাবরুল হোসেন বাবুল সিলেট জেলা ছাত্রলীগের একজন সাহসী সংগঠক ও কর্মী। ইতিমধ্যে তিনি সিলেট শহর ছেড়ে স্ব-দলবলে আমাদের বাড়ীতে এলেন। আমার বড় চাচা আব্দুল আজিজ তখন বিয়ানীবাজার থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি। পাক সেনারা তখন ঢাকা থেকে ধীরে ধীরে সিলেটে আসছে। এই সময় স্থির হলো যে পাক সেনারা যাতে সিলেট হতে বিয়ানীবাজারের দিকে সহজে না আসতে পারে তার জন্য রাস্তায় ব্যরিকেড সৃষ্টি করা।

 

বাবার শখ ছিল শিকারের। তাঁর একটা শিকার করার বন্দুক ছিল। সেই তারিখ আমার মনে নেই। সেদিন বিকাল বেলা আমাদের বাড়ীর সম্মুখে প্রায় শ’দেড়েক মানুষ জমায়েত হল বন্দুক, দা, কুড়াল ও লাঠি ইত্যাদি অস্ত্র নিয়ে এবং সবাই হেঁটে গোলাপগঞ্জের দিকে ছুটলেন রাস্তায় ব্যারিকেড সৃষ্টির জন্য। বাবাও গেলেন। তারপর সব ব্যারিকেড উপেক্ষা করে পাক সেনারা বিয়ানীবাজারে এসে গেল। আমার চাচারা স্বপরিবারে ফুফাতো ভাই (বাবুল ভাই), চাচাতো ভাইসহ ৩ জন ওপারে চলে গেলেন। বাবা গেলেন না।

 

আমরা অনেক পীড়াঁপীড়ি করলাম চলে যাওয়ার জন্য। তার কথা ছিল-এই বাড়ী ঘর দেশ ছেড়ে কোথায় যাব? অতঃপর একদিন রাত্রে পাক সেনারা আমাদের বাড়ী ঘেরাও করলো। পাক সেনারা বাড়ীতে প্রবেশ করা মাত্র মা’ টের পেয়ে বাবাকে বাড়ীর পিছন দিকের দরজা খুলে পালিয়ে যেতে বললেন। যদিও আমাদের ফেলে যেতে তার আপত্তি ছিল। মা’ জোর করে তাকে বের করে দিলেন।

 

পাক সেনারা বাড়ীতে ঢুকেই আমার ফুফা আব্দুল জব্বার (সাংবাদিক হাসানুল হক উজ্জলের পিতা) ফুফাতো ভাই আব্দুন নূর ও চাচাত ভাই বর্তমান পিএইচজি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক আলী আহমদকে আমাদের বৈঠক খানার লোহার খুঁটির সাথে বেঁধে ফেললো এবং আমার চাচা আব্দুল আজিজ ও ফুফাতো ভাই বাবুলের খোঁজ করলো। চাচার ঘরে ঢুকে বঙ্গবন্ধুর ছবি ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ছবি পেয়ে তা মাটিতে ফেলে বুট দিয়ে মাড়িয়ে ফেললো। এভাবে কয়েক দিন অতিবাহিত হল। বাবা আর বাড়ীতে থাকলেন না। বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপন করে থাকলেন। তখন সিলেটে পাক সেনাদের চামুন্ডাদের নিয়ে কমিটি গঠিত হয়েছে।

 

সেই কমিটির এক সভায় পাকিস্তান পন্থী চান্ডাল রাজাকার হাজী ছরকুম আলী, হাজী আব্দুর রহিম (বচন হাজী), মোজাম্মিল আলী (কালা মিয়া) গং-এর নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে অনেক নিরীহ মানুষ, মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এবং আওয়ামীলীগের নেতা কর্মীদের এক তালিকা প্রস্তুুত হল। সেই তালিকায় আমার বাবা, চাচা ও ফুফাতো ভাইয়ের নামও ছিল।

 

এরপর এলো ৭ই জুন, আমাদের ভাগ্য বিপর্যয়ের দিন। চারিদিকে পুরোদমে যুদ্ধ চলছে। সেদিন সকাল অনুমান ১০টার সময় আমাদের গ্রামের এক রাজাকার তৈমুছ আলীর নেতৃত্বে পাক সেনারা আমাদের বাড়ীতে হানা দেয়। আমাদের বাড়ী খুব বড়, লোক সংখ্যা অনেক এবং প্রায় অর্ধেক ভারতে চলে গিয়েছিলো। বাকী যারা ছিল নারী পুরুষ ও শিশুসহ সবাই জড়ো হলো আমার এক চাচা মাহতাব উদ্দিনের গৃহে। বাবা তখন বাহিরে। আমি ও আমার ছোট দু’বোনকে নিয়ে মা ও সেই ঘরে এলেন। পাকসেনারা আমাদের সমস্ত বাড়ী ঘিরে ফেললো। চাচা ও বাবাকে খোঁজ করলো। না পেয়ে সে ঘরে আমরা সবাই জড়ো হয়েছিলাম। সেই ঘরের সম্মুখে এসে একজন সশস্ত্র ঘাতক আমার এক চাচা মুদাচ্ছির আলীর বুকে রাইফেল তাক করে চাচা ও বাবার কথা জানতে চাইলে। তিনি বললেন, তারা বাড়ীতে নেই।

 

অতঃপর বললো-আং মান্নানের স্ত্রী ও ছেলে মেয়েরা কোথায়। উক্ত চাচা প্রাণের ভয়ে বললেন, আছে তারা ওই ঘরে। পাক সেনা বললো-ডাকো তাদের। অতঃপর তিনি আমার মাকে ডাকলেন-মা’ আমার ছোট বোন শিখাকে কোলে নিয়া বের হয়ে এলেন। পাক সেনারা আমার মাকে তাদের সাথে থাকায় যেতে বললো এবং এও বললো যে-আমার বাবা হাজির হলে তাকে ছেড়ে দেবে। অতঃপর পাক সেনারা আমার মাকে ও ছোট বোনকে নিয়ে চলে গেল। যাবার পথে জনৈক হোমিও ডাক্তার পংকি মিয়াকেও নিয়ে গেল। ওই দিনই ধরে আনে মাথিউরার প্রখ্যাত পল্লী গায়ক কমর উদ্দিনের স্ত্রী এবং দুই পুত্রকে, আরো হিন্দু এক পরিবারের নারী পুরুষ ও শিশুদের। ফতেহপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আলতাফ হোসেনের বাবা তাহির আলী ও আবুল হোসেন নিজামকে।

 

পাক সেনারা আমাদের বাড়ী থেকে চলে যাওয়ার সাথে সাথেই খবর পেয়ে বাবা বাড়ীতে চলে যাওয়ার সাথে সাথে খবর পেয়ে বাবা বাড়ীতে এলেন। তিনি আমি ও আমার বোন শিল্পীকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন। সবাই বাঁধা দিলেন থানায় হাজির না হওয়ার জন্য। কিন্তু তিনি সবার বাঁধা উপেক্ষা করে সাথে সাথে থানায় হাজির হলেন। তিনি থানায় উপস্থিত হওয়া মাত্র পাকসেনারা মা ও ছোট বোনকে ছেড়ে দিলো। মা বাড়ীতে এলেন। পরদিন সকালে আমরা বাড়ী ছেড়ে পার্শ্ববর্তী জেলেপাড়ার জনৈক খুশীর আলী বাড়ীতে আশ্রয় নিলাম। এই পরিবারের কাছে আমরা আজীবন ঋণী থাকবো। ঐদিন অর্থাৎ ৮ই জুন বিকাল অনুমান ৪ টার সময় পরপর কয়েকটি গুলির শব্দ শুনলাম। আমরা ভয়ে মায়ের কোলে মুখ লুকালাম। ভেঙ্গে গেলো আমার মায়ের কাঁকন। শুনলাম বাবাসহ যাঁদের ধরেছিল সবাইকে মেরে ফেলেছে।

 

আরো সহস্র পরিবারের মত আমরা হলাম পিতৃহারা, মা’ হলেন বিধবা। বিয়ানীবাজার হাসপাতালের নিকট সিএন্ডবি রাস্তার ধারে রাঁধুনীর টিলা বলে কথিত টিলার ঘাতকরা আমার বাবাসহ আরো ১৮ জনকে মেরে গর্ত করে পুঁতে ফেলে। অত:পর বাবার বন্ধু আবুল লেইছ আমাদের নিয়ে গেলেন আমাদের গ্রামের খাদিমবাড়ীর জনৈক মুহিব আলী দর্জির বাড়িতে। ইতিমধ্যে পাক সেনারা আমাদের বাড়িতে আমাদের ঘর, মুক্তিযোদ্ধা খলিলুর রহমানের ঘর এবং আবুল লেইছের গৃহখানা জ্বালিয়ে দেয়। আবুল লেইছকে ধরে নিয়ে শারীরিক নির্যাতন চালায়। দেশ স্বাধীন হলো।

 

আত্মীয় স্বজনরা একে একে সবাই এলেন ভারত থেকে। শুধু ফিরলেন না আমার বাবা। আওয়ামীলীগের প্রখ্যাত নেতা দেওয়ান ফরিদ গাজীর উপস্থিতিতে পুলিশ বধ্যভূমির গণকবরগুলো খুঁড়লো। আমি আমার বাবার লুঙ্গির ছেঁড়া টুকরো দেখে সনাক্ত করলাম। লাশ নেই শুধু কংকাল। যাঁরা শহীদ হলো তাঁরা দিয়ে গেল বাংলার মানুষকে বাংলাদেশের মাটিতে বুক ভরে নি:শ্বাস নেওয়ার অধিকার। দীর্ঘ ৪৪ বছর পর বাংলার মাঠিতে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে-এটাই বড় শান্তনা।