আহা, আজি এ বসন্তে…….

BOSONজুনেদ ইকবাল : শীত কখন এসে চলে গেল, কেউ ঠিকমতো ঠাহর করে উঠতে পারেনি এবার। ‘ডাকাতপড়া’ শীতের আমেজ বুঝি এই দেশ ভুলতেই বসেছে। উষ্ণায়নের প্রভাব, এলনিনো, কত্তোকিছু বাগড়া বসিয়েছে এবারের শীতে! কিন্তু বসন্ত? মাঘের মধ্যভাগ থেকেই নিজের জৌলুস সদম্ভে প্রকাশ করেছে সে। ঋতুরাজ বলে কথা! দীন-হীন, আটপৌড়ে শীতের সলজ্জ ও করুণ দিবসকে উষ্ণ হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে বসন্ত এসে গেলো রাজমুকুট মাথায় নিয়ে। বসন্ত এমনই। বেপরোয়া, সদম্ভ, রাজসিক আর তারুণ্যের মতো যৌবনোচ্ছ্বাসে উন্মাতাল।

বসন্ত এলেই মানবপ্রাণে অফুরাণ চঞ্চলতার আবেশ ঘনিয়ে আসে। বসন্ত এলেই চনমনে প্রাণ অপূর্ব মাধুরীরাগে গেয়ে ওঠে- ‘আহা আজি এ বসন্তে…’। বিশুষ্ক হৃদয়ে ভালবাসার উন্মত্ত ঝড় তোলা প্রকৃতি অনবরত উসকানি দিয়ে যায়- ভালোবাসো, ভালোবাসো বলে।

হ্যাঁ, বসন্ত তো ভালবাসারই ঋতু। তাবৎ ব্রহ্মাণ্ড বসন্তকে জেনেছে এভাবেই। বসন্ত আছে যাদের, তাদের কি ভালবাসবার অন্য উপলক্ষ্য লাগে? কিন্তু পুঁজির উসকানি বারবার লাভ ও লোভের স্রোতের দিকেই টেনে নিয়ে চলে অন্ধদের। আর যারা বসন্তে গরবিত, তাদের কেবল বসন্ত হলেই চলে। বিশুষ্ক পত্রপল্লব যখন শীতের যন্ত্রণা ভুলে আড়মোড়া ভেঙে অবগুণ্ঠন খুলে, পলাশ, শিমুল, কৃষ্ণচূড়ার রঙে যখন চারপাশ রাঙা হয়ে ওঠে, অদ্ভূত সুবাসিত ভোর যখন তরঙ্গায়িত হয় দিনের প্রথমার্ধে, তখন আপন রঙেই তৃষিত মানব খুঁজে পায় আপন আশ্রয়।

বসন্ত সারা বিশ্বেই আরাধ্য ঋতু। মনোহরি এ ঋতুর আবহ একেক জায়গায় একেক রকম। নাতিশীতোষ্ণ এ বঙ্গীয় অঞ্চলে বসন্ত সবসময়ই শীতের শেষে কুয়াশার ঘোর লাগা অন্যরকম ‘শীতল উষ্ণতা’ নিয়েই আসে। শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে তার আভাস টের পাওয়া যায়। চিত্ত চঞ্চল হয়ে ওঠে। সমস্ত চরাচরকে প্রতি মুহূর্তে নতুন করে আবিষ্কার করে চলে বিবাগী মন।

আজ পয়লা ফাল্গুন; শুরু হলো বসন্ত ঋতু। ষড়ঋতুর এই বাংলায় বসন্তই সবচেয়ে বেশি আবেদন জাগানীয়া। বসন্তেই সবচেয়ে বেশি প্রফুল্ল হয়ে ওঠে সে। আর শ্রীভাণ্ডারে এবার বাড়তি পাওনা ‘স্বরস্বতীর’ অধিষ্ঠান। জ্ঞান ও সুন্দরের অপূর্ব সম্মিলনই ঘটছে এবার। এর বাইরে যারা ‘ভালবাসা দিবস’র কথা বলে বাড়তি আনন্দ উৎপাদন করতে চান, ক্ষতি নেই। সবই বসন্তেরই মহিমা হয়ে থাকবে।

গ্রাম-গঞ্জে বসন্তকে বরণের আনুষ্ঠানিকতা নেই। গ্রাম বসন্তকে আত্মিকরণ করেছে। কিন্তু নগরে বসন্তকে আয়োজন করে আনতে হয়। সম্ভবত নগরের ক্ষেত্রে বসন্ত বড়ই অভিমানী ঋতু। না হলে বসন্তের জন্য আলাদা উৎসব হবে কেন? আলাদা আয়োজন হবে কেন? কেনই বা আলাদা সাজগোজ, আলাদা উন্মাদনা? এর উত্তর অবশ্য আছে আমাদের সংস্কৃতির বিদ্যমান দুর্দশায়। ভিনদেশি সংস্কৃতির আগ্রাসন ও উগ্রবাদের অবিরাম উল্লম্ফনের বিপরীতে একটি পরিমিত ও পরিশীলিত সাংস্কৃতিক উৎসবকে ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যেই বসন্তে এতো আয়োজন করতে হয় বাঙালিকে। এর মধ্য দিয়ে শেকড়চ্যূত নতুন প্রজন্মও খুঁজে নিতে পারে প্রকৃতিসর্বস্ব এক সুন্দর ও শালীন উৎসবকে।