লন্ডনে স্মরণ সভায় কাজির বাজার সেতু নাম করণের দাবি

UKKKKজুয়েল রাজ, লন্ডন : সিলেটে জন্ম নেয়া শোষিত মানুষের মুক্তি আন্দোলনের কিংবদন্তী জননেতা, পীর হবিবুর রহমানের নামে সদ্য নির্মিত সিলেট কাজির বাজার সেতুর নাম করণের দাবি জানিয়েছেন ব্রিটেন প্রবাসীরা। মঙ্গলবার পূর্ব লন্ডনে মন্টিফিউরী সেন্টারে দ্বাদশ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রয়াত জননেতার জীবন ও কর্ম নিয়ে সদ্য নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘রাজনীতির শুদ্ধ পুরুষ’ এর প্রথম প্রদর্শনী উত্তর আলোচনায় বক্তারা এই দাবি করেন।
তারা বলেন, পীর হবিবুর রহমান ছিলেন রাজনীতির আপাদমস্তক একজন শুদ্ধ পুরুষ। রাষ্ট্রের প্রয়োজনেই এমন একজন রাজনীতিককে বাঁচিয়ে রাখা আমাদের জন্যে জরুরী।
পীর হবিবুর রহমান ফাউন্ডেশন আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি সাংবাদিক সৈয়দ আনাস পাশা। জামাল আহমেদ খানের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনায় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রবীণ সংগঠক, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ সভাপতি সুলতান শরীফ, ষাটের দশকের ছাত্রনেতা ও পীর হবিবুর রহমান স্মৃতি সংসদের সভাপতি মাহমুদ এ রউফ, জয়েন্ট কাউন্সিল ফর ওয়েলফেয়ার অব ইমিগ্রেন্টস (জেসিডব্লিউআই) এর সদ্য বিদায়ী চীফ এক্সিকিউটিভ প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, সদ্য নির্মিত কাজির বাজার সেতু পীর হবিবুর রহমানের নামে নামকরণ হলে নতুন প্রজন্মের কাছে এটিই প্রমাণ হবে যে সৎ রাজনীতিক হতে রাষ্ট্র উৎসাহ যোগায়। দক্ষিণ সুরমার সন্তান পীর হবিবুর রহমানকে রাজনৈতিক সহনশীলতার প্রতীক ও ঐক্যের সেতুবন্ধন মন্তব্য করে সভায় বলা হয়, আজকের যুগে শোষিত মানুষের মুক্তি আন্দোলনের ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন একমাত্র বঙ্গবন্ধু কন্যাই করতে পারেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইতোমধ্যে এর প্রমাণ রেখেছেন। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ প্রয়াত পীর হবিবুর রহমানের স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখতে কাজির বাজার সেতু তার নামে নামকরণ করবেন প্রধানমন্ত্রী এমনটিই আশা করেন অনুষ্ঠানের বক্তারা।
অন্যতম অতিথির বক্তব্যে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সভাপতি, প্রবীণ রাজনীতিক সুলতান শরীফ বলেন, ভিন্ন দলের হলেও বঙ্গবন্ধু প্রয়াত পীর হবিবকে কতটুকু গুরুত্ব দিতেন তা আমি নিজেও দেখেছি। পীর হবিবুর রহমানকে সততার প্রতীক একজন বিরল নেতা হিসেবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, তাকে কে মূল্যায়ন করলো বা না করলো এতে কিছুই আসে যায় না, রাষ্ট্রের প্রয়োজনে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজনে, আমাদের নিজেদের প্রয়োজনেই তার স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখা জরুরী।
মাইগ্রেন্ট ভয়েসের চেয়ারম্যান হাবিব রহমান পীর হবিবুর রহমানকে একজন বিরল রাজনীতিক হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, তিনি অনুকরণীয় হলে, তার মত নেতা সৃষ্টি করতে পারলে জাতি হিসেবে আমরা লাভবান হবো, রাষ্ট্রের সম্মান বাড়বে।
সাংবাদিক আবু মুসা হাসান প্রয়াত পীর হবিবুর রহমানকে শোষিত মানুষের মুক্তি আন্দোলনের আলোকিত নেতা হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, রাজনীতির প্রয়োজনে, দেশের প্রয়োজনে এই নেতাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এসএসবিএর চেয়ারম্যান আজিজ চৌধুরী প্রয়াত নেতা পীর হবিবকে তার আদর্শের পুরুষ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
অনুষ্ঠানে পীর হবিবুর রহমানের দুই ছেলেসহ অনেক আত্মীয় স্বজনও উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, অবিভক্ত পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ন্যাপের যুগ্ম সম্পাদক, স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক, ও গণতন্ত্রী পার্টির কেন্দ্রীয় সভাপতি পীর হবিবুর রহমান ছিলেন পাকিস্তানী শাসনামল ও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক পুরোধা ব্যক্তিত্ব, রাজনীতির এক আপাদমস্তক শুদ্ধ পুরুষ। পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকে পূর্ববঙ্গে এবং বাংলাদেশ আমলে যত গণতান্ত্রিক-প্রগতিশীল আন্দোলন সংগ্রাম হয়েছে সবগুলোর সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন সংগঠক হিসেবে। ব্রিটিশ শাসিত ভারতে, আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের অনুসারী মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের কর্মী হিসেবে রাজনীতিতে হাতেখড়ি পীর হবিবের। পরবর্তীতে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে শরিক অনেক যুবকের মতো তার মতাদর্শেও পরিবর্তন ঘটে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মুসলিম লীগের বলয় থেকে বেড়িয়ে এসে আত্মগোপনকারী কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের সান্নিধ্যে সমাজতন্ত্রের মন্ত্রে উদ্দীপ্ত হন তিনি। ৪৮ সালেই যোগ দেন কমিউনিস্ট প্রভাবিত ইয়ুথ লীগে। এরপর গণসংগঠন হিসেবে কাজ করেন আওয়ামী লীগে। ৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনের মধ্যদিয়ে বামপন্থি নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন করলে পীর হবিব এই সংগঠনের প্রথম সারির নেতা হিসেবে মনোনীত হন। ভাষা আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ত্রিকালদর্শী এই রাজনীতিক ছিলেন অন্যতম শীর্ষ সংগঠনের ভূমিকায়।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দেশ ও দেশের মানুষের উন্নয়নে বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে প্রায়ই তিনি চিঠি লিখতেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। মানুষের ভালোবাসার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকার পাশাপাশি নিজের নিরাপত্তা নিয়েও সচেতন থাকার পরামর্শ দিতেন তিনি তার ‘ভাতিজি’ শেখ হাসিনাকে।