বিয়ানীবাজারে জামায়াত-শিবির মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্টান রুগ্ন, সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষুব্দ

j sমিলাদ জয়নুল :বিয়ানীবাজার পৌরশহরসহ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে জামায়াতে ইসলামীর মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্টানগুলো ক্রমেই রুগ্ন হয়ে পড়ছে। এসব প্রতিষ্টানের কোনটিই লাভের মুখ দেখেনি। লাখ-লাখ টাকা ব্যায়ে প্রতিষ্টিত প্রতিষ্টানগুলোর অবস্থা ‘ঘুঁণে ধরা কাঠের’ মত। কেন এমন হল, এ প্রশ্নের উত্তর নেই কারো কাছে। লোকসানের অজানা রহস্য খুঁজে ক্লান্ত বিনিয়োগকারীরা। তারা জামায়াতি প্রতিষ্টানগুলোকে হায়-হায় কোম্পানীর সাথে তুলনা করে সংশ্লিষ্টদের প্রতি ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।
সূত্র জানায়, গত চারদলীয় জোট সরকারের সময় থেকে বিয়ানীবাজারে ‘আভিজাত্যপূর্ন’ নাম দিয়ে কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্টান খুলে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষস্থানীয় কিছু নেতৃবৃন্দ। রাকাম, তামাম, তুনজি, তিজারাহ, সিহাম, মারাম-এমন অত্যাধুনিক নামে যত্রতত্র খোলা হয় ব্যবসা প্রতিষ্টানগুলো। শুধু পৌর এলাকায়ই নয়, উপজেলার বৈরাগীবাজার, চারখাই বাজার, চারাবই বাজারসহ অনেক গ্রামীণ এলাকায়ও ‘আধুনিক’ নামের প্রতিষ্টান খোলা হয়। ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক ব্যবসার নামে চেয়ারম্যান, এমডিরা প্রচারণা চালানোর কারণে সাধারণ মানুষ তাতে আকৃষ্ট হয়। গ্রাম এলাকার মানুষের কাছে জামায়াত নেতৃবৃন্দের গ্রহণযোগ্যতা থাকার কারণে তারাও সরল মনে বিনিয়োগ শুরু করে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র, অত্যাধুনিক ডেকোরেশন, অফিস, বিশ্রামাগার, নামাজ ঘরসহ সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থা রাখা হয়। একেকটি প্রতিষ্টানে বিনিয়োগ করা হয় ৫০ লাখ টাকার উপরে। কোনটিতে আবার কোটি টাকার কাছাকাছি। ব্যবসা প্রতিষ্টান তুনজি’তে বিনিয়োগকারী আঙ্গুরা মোহাম্মদপুরের শামীম আহমদ বলেন-পরের টাকায় বিলাসী জীবন শুরু করেন প্রতিষ্টানের কর্ণধাররা। তারা মালামাল ক্রয়ের নামে ঢাকায় যাতায়াত শুরু করেন। সেখানে ছিল তাদের ‘সেকেন্ড হোম’।
জানা যায়, ঢাকায় গিয়েও মালামাল ক্রয়ের নামে কমিশন নিয়েছেন, অন্য প্রতিষ্টানের চাইতে তুলনামূলক অপছন্দনীয় জিনিস ক্রয় করেছেন। কোন জবাবদিহিতা ছিলনা কারো কাছে। ফলে জামায়াত নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক প্রতিষ্টানগুলো শহরের অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্টানের সাথে প্রতিযোগীতায় ঠিকতে পারেনি। শুরুতেই গুজব রটে-বিলাস বহুল এসব প্রতিষ্টানে জিনিসপত্রের দাম বেশী। তাই সাধারণ ক্রেতারা এসবের দ্বারে-কাছেও যায়নি। সূত্র জানায়, প্রতিষ্টানগুলোর চেয়ারম্যান-এমডিরা কাঁড়ি-কাঁড়ি বেতন নিয়েছেন। কর্মচারীরাও এক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকেনি। অনেক বিনিয়োগকারী নিজেও প্রতিষ্টানগুলোতে চাকরী করেছেন। প্রতিষ্টানের টাকা ব্যায় করে কেউ তৈরী করেছেন বাড়ী, কেউ করেছেন নির্বাচন।
সূত্র আরো জানায়, মালামাল বিক্রির সময় ক্রেতাদের মেমো দিয়ে তাতে বিক্রিত পণ্যের কোড নাম্বার লিখে দিতেন। এত কঁড়াকঁড়ি স্বত্তেও প্রতিষ্টানে আয় নেই কেন? প্রথমদিকে এমন অবস্থার কারণ জানতে চাইলে চেয়ারম্যান-এমডিরা প্রতিষ্টানের লাভ দিয়ে অন্য খাতে বিনিয়োগ করছেন বলে জানান। বিশেষ করে জায়গা-জমি ক্রয় করছেন, শহরে ব্যবসা খুলছেন, গাড়ী কিনেছেন-এমন ভূয়া তথ্য উপস্থাপন করতেন। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে জানা গেল এসবের কিছুই নেই। জামায়াতি লোকজন শুধুই তাদের ঠঁকিয়েছেন। তাদের এ রকম প্রতারণায় নি:স্ব বিনিয়োগকারীদের দূর্ভোগের শেষ নেই। অনেকে আবার মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ব্যবসায় ক্ষতি দেখিয়ে জামায়াত নিয়ন্ত্রিত এসব প্রতিষ্টান গুটিয়ে নেয়া হয়েছে। যে দু’একটি প্রতিষ্টান এখনো চলছে সেগুলো ঠিকে আছে শুধু লোকলজ্জার ভয়ে। কোনমতে ঠিকে থাকা প্রতিষ্টানগুলোর হিসাবও দেয়া হচ্ছেনা।
ঠিক উল্টো পরিস্থিতি বিনিয়োগকারীদের। তারা ওইসব ব্যবসা প্রতিষ্টানের কর্তাদের দ্বারে-দ্বারে ঘুরছেন। কিন্তু বিনিয়োগ করা টাকার হিসাব নেই, লাভ-ক্ষতির তথ্যও নেই। চেয়ারম্যান-এমডির কাছে শুধু টাকা ফিরে পাওয়ার আশ্বাস। এই আশ্বাসে আর বিশ্বাস নেই বিনিয়োগকারীদের। অনেক প্রতিষ্টান গুটিয়ে নেয়ায় বিনিয়োগকারীরা সংশ্লিষ্টদের দেখা পাননা। ঘন্টার পর ঘন্টা ফোন করার পর কোন ক্ষেত্রে জুটে গলাধাক্কা, অপমান। কাউকে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেয়া হয়- সুবিধাজনক সময়ে টাকা ফিরিয়ে দেয়া হবে। কিন্তু এই সুবিধাজনক সময় কবে আসবে-তা কেউ সঠিক করে জানাতে পারেনি। কলেজ রোডের একটি প্রতিষ্টানে বিনিয়োগকারীদের প্রতি লাখে ৫ হাজার টাকা করে ফিরিয়ে দেয়ার প্রতিশ্র“তি দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে লাখে ৯৫ হাজার টাকা করে ক্ষতির শিকার হচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। একাধিকবার স্থান বদল করা আরো একটি জামায়াতি প্রতিষ্টানের কর্তাদের খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ওই প্রতিষ্টানের এমডির বিরুদ্ধে বিনিয়োগকারীদের সাথে খারাপ ব্যবহারের অভিযোগ আছে।
জামায়াত নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্টানে রাজনৈতিক হামলার কারণে লোকসান হয়েছে, এমন খবরের অনুসন্ধান চালিয়ে জানা গেছে আরো নতুন তথ্য। একেকটি রাজনৈতিক হামলায় প্রতিষ্টান প্রতি সর্বোচ্চ ৩-৫ লাখ টাকা ক্ষয়ক্ষতি হলেও এর পরিমাণ দেখানো হয়েছে কয়েকগুণ বেশী। এটি বিনিয়োগকারীদের সাথে প্রতারণার কৌশল বলে মন্তব্য করেছেন অনেকেই। তাছাড়া প্রতিষ্টান দেখিয়ে ব্যাংক ঋণ গ্রহণ, ব্যাক্তি পর্যায়ে ঋণ নিয়ে প্রতিষ্টানগুলোকে রুগ্ন করে তোলা হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের কাছে দেয়া ব্যবসার চুক্তিনামার কাগজগুলো এত দূর্বল করে সাজানো হয়েছে যাতে আইনের আশ্রয় নিলে কেউ প্রতিকার না পায়। জামায়াতি প্রতিষ্টানের রুগ্নদশা নিয়ে শীর্ষস্থানীয় কেউ কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। তাদের একটাই অজুহাত-রাজনৈতিক কারণে লোকসান হয়েছে। এদিকে তিলপারা ইউনিয়নের দাসউরা সিনিয়র মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা বদরুল ইসলাম জানান, নিজে জামায়াত সমর্থন করলেও দলের নেতৃবৃন্দ তাকে ডুবিয়েছেন। তার প্রতিষ্টিত অর্থলগ্নি প্রতিষ্টান থেকে বিতরণ করা টাকা গ্রাহকদের কাছ থেকে উত্তোলন করে হারিয়ে যাওয়া ইমেজ পুণরুদ্ধার করবেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। এ প্রসঙ্গে তুনজি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুফাসসীর আহমদ ফয়েজী বলেন, ব্যবসায় লাভ-লোকসান থাকবে। রাজনৈতিক কারনে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্টান লোকসান গুনেছে। তবে সাধারন বিনিয়োগকারীদের টাকা কিছুটা হলেও ফেরত দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।