পূর্ণ হলো না বিয়ানীবাজারের নাজিমের মা ও ভাই-বোনদের স্বপ্ন

NAZIM @# 23খলিলুর রহমান স্টালিন ও শিপার আহমদ :: ঢাকায় দুর্বৃত্তদের হাতে খুন হওয়া সিলেটের বিয়ানীবাজারের নাজিম উদ্দিন (২৬) ছোটবেলা থেকেই ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। প্রতিটি প্রতিযোগিতমুলক পরীক্ষায় এর প্রমাণও রেখেছিলেন তিনি। প্রাথমিক সমাপনিসহ বিভিন্ন পরীক্ষায় পেয়েছেন বৃত্তি। সংঘতকারণেই তার প্রতি ছিল পরিবারের সদস্যদের আলাদা দৃষ্টি।

নাজিমকে নিয়ে মা ও ভাই-বোনদের অনেক স্বপ্ন ছিল। কথা বলায় পটু ছেলেটি প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের গন্ডি পেরোনোর পর যখন আইনশাস্ত্রে পড়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন তখন পরিবারের সবাই তাকে উৎসাহ যোগান। আর একই সাথে তারা বুকে লালন করতে থাকেন সবার আদরের নাজিম একদিন বড় আইনজীবী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবেন। কাজ করবে সমাজের অসহায়-পিড়িত মানুষের জন্য।

নাজিম উদ্দিন নিজের ও স্বজনদের স্বপ্নের বাস্তব রূপ দিতে পড়াশুনাও চালিয়ে যান একাগ্রতার সাথে। যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে আইন বিষয়ে সিলেট লিডিং ইউনিভার্সিটি থেকে অর্জন করেন স্নাতক ডিগ্রি।

এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য সিলেট থেকে পাড়ি দেন রাজধানী ঢাকায়।স্নাতকোত্তর কোর্সে ভর্তি হন ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। গত জানুয়ারি তিনি ঢাকায় গিয়েছিলেন। আর এর মাত্র তিন মাস পেরুতে না পেরুতেই বুধবার রাতে দুর্বৃত্তদের হাতে নির্মমভাবে খুন হন নাজিম।

আইন বিভাগের ষষ্ঠ ব্যাচ, ‘বি’ সেশন’র সান্ধ্যকালীন ব্যাচের শিক্ষার্থী নাজিম উদ্দিন লেখাপড়ায় যেমন ছিলেন মনোযোগী তেমনি সহপাঠী ও বন্ধুবান্ধবদের কাছে ছিলেন প্রিয়। শিক্ষক কিংবা সহপাঠী-বন্ধুবান্ধব কারো সাথেই তিনি কোনো খারাপ আচরণ করেননি -জানান সহপাঠীরা।

তাছাড়া নিজ গ্রাম ও এলাকার লোকজনের কাছেও নাজিম ছিলেন অত্যন্ত প্রিয়। পরিচিতজনদের সাথে দেখা হলে ভদ্রতার সাথে কথা বলতেন, কারো সাথে কোনো দুর্ব্যবহার করেননি। তাই দুর্বৃত্তদের হাতে নাজিমের খুনের সংবাদ পাওয়ার পর তার স্বজনদের পাশাপাশি এলাকাবাসীর মাঝে নেমে আসে শোকের ছায়া। কান্নায় ভেঙে পড়েন অনেকে। ঘৃণ্য এ হত্যাকান্ডের ব্যাপারে জানতে নাজিমের বাড়িতে জড়ো হন বিভিন্ন বয়সের বেদনাতুর মানুষ।

বৃহস্পতিবার আলাপকালে তারা নাজিম হত্যাকান্ডে তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণা প্রকাশ করে বলেন, নাজিম কারো ক্ষতি করতে পারে না। তাকে যারা খুন করেছে তারা নরপশু। এ হত্যাকাণ্ড জড়িতদের দ্রুত সময়ের মধ্যে শনাক্ত করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার জন্যও তারা প্রশাসনের প্রতি দাবি জানান।

আাছিরগঞ্জ দিশারী ফ্রি ক্যাডেট স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক এনামুল কবির বলেন, ‘নাজিম আছিরগঞ্জ দিশারী ফ্রি ক্যাডেট স্কুলে ৫ শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপাড় করেন। ওই স্কুলে অধ্যয়নরত অবস্থায় নাজিম উদ্দিন খুবই ভালো ছাত্র ছিল। প্রাথমিক সমাপনি পরীক্ষায় বৃত্তি পায় সে। এছাড়াও বেসরকারিভাবে অনেকবার সে বৃত্তি লাভ করেছে।’

নাজিম উদ্দিনের মামাতো ভাই ছাদেক আজাদ বলেন, নাজিমরা ৫ ভাই ও দুই বোন ছিল। ভাইদের মধ্যে নাজিম ৪র্থ। একমাত্র নাজিমই বাংলাদেশে থাকে। অন্যরা প্রবাসে বসবাস করে। নাজিম খুব শান্ত প্রকৃতির লোক ছিল বলে জানান তিনি।

সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার তিলপাড়া ইউনিয়নের টোকা ভড়াউট গ্রামের মৃত আব্দুস সামাদের ছেলে নাজিম উদ্দিন। ৫ ভাই ও ২ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন ৪র্থ। বড় ভাই জুলহাস উদ্দিন মারা গেছেন। অপর ৩ ভাই প্রবাসে থাকেন। তাদের মধ্যে শামীম আহমদ ও সবার ছোট জসিম উদ্দিন যুক্তরাজ্য এবং সুনাম উদ্দিন ফ্রান্স প্রবাসী। তাদের মা তৈরন নেচ্ছা ও ছোটবোন নাসিমা বেগম বিয়ানীবাজারে গ্রামের বাড়িতে থাকতেন। বড় বোন পারুল বেগমের বিয়ে হয়েছে কয়েক বছর আগে।

মা ও ছোটবোন নাসিমা বেগম বিয়ানীবাজারের বাড়িতে থাকলেও লেখাপড়া করার সুবাধে দীর্ঘদিন নাজিম উদ্দিন সিলেট নগরীতে বসবাস করেন। নিজ এলাকায় আাছিরগঞ্জ দিশারী ফ্রি ক্যাডেট স্কুল থেকে প্রাইমারী, আসিরগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করার তিনি সিলেটের স্কলার্স হোম স্কুল এন্ড কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হন সিলেট লিডিং ইউনিভার্সিটিতে। অর্জন করেন এলএলবি (অনার্স) ডিগ্রি।

উল্লেখ্য, বুধবার রাতে রাজধানীর সূত্রাপুরে নাজিম উদ্দিনকে কুপিয়ে ও মাথায় গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।