রাষ্ট্রীয় অবহেলা আর বঞ্ছনার বেদনা নিয়ে চলে গেলেন যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা ‪আবদুল হান্নান‬

1

হাবিব আহমদ দত্তচৌধুরী :: রাষ্ট্রীয় অবহেলা অার বঞ্ছনার বেদনা নিয়ে অনন্তলোকে চলে গেলেন আমাদের সিলেটের এক যুদ্ধাহত বীর সন্তান মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হান্নান। তিনি দীর্ঘদিন হাঁপানি রোগে আক্রান্ত থেকে সুচিকিৎসার অভাবে বিগত ১২ এপ্রিল ২০১৬, রোজ মঙ্গলবার রাত ১১.০০ টায় নিজ বাড়িতে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।(ইন্নালিল্লাহি…রাজিউন)।

তাঁর জীবদ্দশায় বিগত ২০১৫ সালের ২৬ মার্চ আমি তাঁর যুদ্ধকীর্তির কিছু ঐতিহাসিক বিবরণ উদ্ধার করার মানসে তাঁর নতুন বসতিস্থল বিয়ানীবাজার উপজেলার দুবাগ ইউনিয়নের নয়াদুবাগ গ্রামের জরাজীর্ণ কুটিরে গিয়েছিলাম। শয্যাশায়ী হান্নান ভাই অনেক কষ্টে আমাকে তাঁর যু্দ্ধকালীন কিছু স্মৃতি বলেছিলেন। নিম্নে তাঁর মুখনিসৃত সংক্ষিপ্ত স্মৃতিচারণটুকু তুলে ধরলাম।

*আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমার জন্ম ১৫ অক্টোবর ১৯৫২ সালে। কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্রসহ অন্যান্য কাগজপত্রে ভুলবশত আমার জন্মতারিখ ১৫.১০.১৯৪৫ লিখা হয়েছে। আমার জন্মস্থান সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার উপজেলার খাসা(দিঘীরপার) গ্রামে। পিতা মৃত মো. জুনাব আলী ও মাতা মৃত জয়তুন্নেছা।

2১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে আমি মেট্রিক পরীক্ষা দিয়ে ফলাফলের অপেক্ষায় বসে আছি। এই অবসরে আমি স্থানীয় আনসার বাহিনীর সদস্যভুক্তি নিয়ে হাল্কা অস্ত্রচালনার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। এমতাবস্থায় বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের অগ্নিঝরা ভাষণ ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ আমার যুবকমনে স্বদেশমুক্তির বহ্নিশিখা জ্বেলে দেয়। ২৬ মার্চ শুরু হয়ে গেল আমাদের মুক্তিযুদ্ধ।

আমরা বিয়ানীবাজার থানার আনসার, মুজাহিদ, ছাত্র ও অন্যান্য পেশার ৪৯ জন মুক্তিপাগল যুবক আনসার বাহিনীর পি.সি. মাথিউরা গ্রামের কাজী আলাউদ্দিনের নেতৃত্বে অনুমান এপ্রিলের মাঝামাঝিতে মৌলভীবাজার সার্কিট হাউসে গমন করি। সেখানে গিয়ে ৪ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর সিআর দত্ত-র অধীনে সপ্তাহখানেক পাকশত্রুর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধ করি। পাকশত্রুর উন্নত সমরপ্রস্তুতির কারণে আমরা পিছু হটতে বাধ্য হই। একপর্যায়ে আমরা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতের আশ্রমবাড়ি হয়ে আসামের করিমগঞ্জ শ্যামসুন্দর হাইস্কুলে মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুটিং ক্যাম্পে যোগদান করি। সেখানে দু’দিন থাকার পর এমএনএ ফরিদ গাজী ও বিয়ানীবাজার থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি জনাব আবদুল আজিজের নির্দেশে আমরা আসামের ইন্দ্রনগর প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে চলে যাই।

ইন্দ্রনগর প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে আমরা বিভিন্ন অস্ত্রচালনা ও বিস্ফোরক বিষয়ে একমাস কঠোর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। আমরা ৪ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর সিআর দত্ত-র অধীনে ইকো-৪ মাছিমপুর সাব-সেক্টরে ছিলাম। আমাদের সাব-সেক্টর কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন রব।
ভারতে প্রশিক্ষণ সমাপনান্তে আমাদেরকে কৈলাশহর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ক্যাম্প কমান্ডার ছিলেন মুজাহিদ বাহিনীর ক্যাপ্টেন মাসুক আহমদ। তাঁর কাছে ৯ মে সংবাদ আসে যে, মৌলভীবাজারের শেরপুর ব্রিজ ও আশপাশের এলাকায় পাকশত্রুর এক শক্ত অবস্থান রয়েছে। ঐদিনই সিদ্ধান্ত হয় শেরপুর ব্রিজ অপারেশনের। রাত ১১.০০টায় আমাদের ২৫ জন যোদ্ধার একটি প্লাটুনকে হাবিলদার শামছউদ্দিনের নেতৃত্বে প্রেরণ করা হয়। ১০ মে সূর্যোদয়ের আগেই আমরা শেরপুর ব্রিজে পাকশত্রুর অবস্থানের উপর মরণপণ আক্রমণ চালাই। প্রায় ৪ ঘন্টার মতো যুদ্ধ চলে। একপর্যায়ে আমাদের উপর পাকবাহিনীর বিমান হামলা শুরু হয়। সকাল ৮ টার দিকে বিমান থেকে নিক্ষিপ্ত একটি শেলের আঘাতে আমার বাম পায়ের হাটুর ঘিলা উড়ে যায়। আহত অবস্থায় আমাকে সহযোদ্ধারা মাছিমপুর হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। আমাদের যোদ্ধারা শেরপুর ব্রিজের অবস্থান থেকে শত্রুকে হটিয়ে দিতে সক্ষম হয়। বেশকিছু শত্রু মারা পড়ে। আমাদের মধ্যে আল্লাহর রহমতে প্রাণহানি ঘটেনি। কয়েকজন মাত্র আহত হয়।

4

আমি মাছিমপুর হাসপাতালে মাসাধিক কাল চিকিৎসায় থাকি। পায়ের হাটুতে স্টিল রডের জয়েন্ট স্থাপন করা হয়। কাঠের ক্র্যাচে ভর দিয়ে মোটামুটি চলাচলের উপযুক্ত হই। আমার পঙ্গুত্বের কারণে কর্তৃপক্ষ আমাকে আর সম্মুখযুদ্ধে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। আমার সুন্দর হস্তাক্ষরের জন্য সেক্টর অধিনায়ক মেজর সিআর দত্ত আমাকে আমটিলা মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের কোয়ার্টার মাস্টারের দায়িত্বে নিযুক্ত করেন। দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত আমি নিষ্ঠার সাথে এই দায়িত্ব পালন করি।***”

 

এই হলো যুূ্দ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হান্নানের সংক্ষিপ্ত জবানবন্দি। স্বাধীনতাত্তোর ১৯৭২ সালে স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধাদেরকে “প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল” থেকে ৫০০/= টাকা মূল্যমানের একেকটি অনুদান চেকসহ ব্যাক্তিগত প্যাডে নিজ স্বাক্ষরিত একটি করে অভিনন্দনপত্র প্রেরণ করেন। পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হান্নানকে প্রেরিত পত্র নং- পত্রাক/৪ -ঙ -৭২/সিডি/৩৯৪ তাং- ২৬.২.৭২, চেক নং সিএ ০৩৫৮১৬। তাঁর পঙ্গুত্বের সমর্থনে আরও অনেক দলিলপ্রমাণ থাকলেও জীবিতকালে তিনি সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ছাড়া অন্য কোনো সুবিধা পাননি। রাষ্ট্রীয় গেজেটেও তিনি যুূদ্ধাহত হিসেবে স্বীকৃত(গেজেট নং: ৬৭৯)। অথচ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বরাবরে বারবার আবেদন নিবেদন করেও তিনি মন্ত্রণালয়ের অসাধু কর্মকর্তাদের দ্বারা ইচ্ছাকৃতভাবে বঞ্চিত হন।

5

এখনতো আর তিনি পঙ্গুত্বের দাবি নিয়ে কারো বিরক্তির কারণ হবেন না। এখন তিনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, এক পুত্র ও তিন কন্যা রেখে গেছেন।আমরা এই মহান বীরের আত্মার মুক্তি কামনা করি ও তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই। জয় বাংলা।