ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ ও আমাদের বায়স্কোপ দর্শন

ভারতের উরি সেনা ছাউনিতে ঘুমন্ত ১১ জোয়ানকে হত্যাকাণ্ড নিয়ে যুদ্ধংদেহী অবস্থানে চির বৈরী দুই দেশ ভারত ও পাকিস্তান। একবিংশ শতাব্দীতে যুদ্ধ আদৌ কতোটুকু যুক্তিযুক্ত অথবা দুদেশ যুদ্ধে যাবে কি না তাও ভাবনার বিষয়। যুদ্ধ এখন আর দুই দেশের মধ্যকার বিষয় নয়। পুরোটাই আন্তর্জাতিক বিষয়। কোন দেশ চাইলেই এখন একা যুদ্ধে জড়াতে পারেনা। ইরাক, আফগান যুদ্ধ, হালের সিরিয়ার দিকে একটু তাকালেই সেটা বুঝা যায়।

ভারত পাকিস্তান নিয়ে ইতোমধ্যে রাশিয়া, চীনও নানাভাবে জড়িয়ে গেছে। ভারত পাকিস্তান চাইলেই আক্রমণ পাল্টা আক্রমণে যেতে পারবে না।

ভারত পাকিস্তানের পারমানবিক শক্তি সঞ্চয় ও যুদ্ধের সম্ভাবনা থেকে, ২০১৩ সালে এক গবেষণায় বলা হয়েছিল চির বৈরী প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পারমাণবিক যুদ্ধ বাধলে বিশ্বে দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে। এতে অন্তত ২০০ কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে মানবসভ্যতা।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই দুই দেশের মধ্যে সীমিত পর্যায়েও পারমাণবিক অস্ত্রের লড়াই হলে বিশ্বের আবহাওয়ামণ্ডলের ব্যাপক ক্ষতি ও শস্যক্ষেত্র ধ্বংস হবে। পরিণামে খাদ্য-পণ্যের বিশ্ববাজারে বহু গুণ খারাপ প্রভাব পড়বে। খাদ্যশৃঙ্খলায় দেখা দেবে বিশৃঙ্খলা।

নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী ইন্টারন্যাশনাল ফিজিশিয়ানস ফর দ্য প্রিভেনশন অব নিউক্লিয়ার ওয়্যার এবং ফিজিশিয়ানস ফর সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি এই দুটি সংগঠন এই গবেষণামূলক প্রতিবেদনটি তৈরি করে। এর আগে সংগঠন দুটি ২০১২ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত এক প্রাথমিক প্রতিবেদনে ধারণা দিয়েছিল, এ রকম একটি পারমাণবিক যুদ্ধে ১০০ কোটির বেশি মানুষ মারা যেতে পারে।

গবেষণার দ্বিতীয় সংস্করণে সংগঠন দুটি বলেছে, দুই দেশের সম্ভাব্য পরমাণু যুদ্ধে চীনের ওপর প্রভাবের বিষয়টি তারা অনেকটাই এড়িয়ে গেছে। তবে বিশ্বের জনবহুলতম এই দেশ মারাত্মক খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়তে পারে বলে এতে আশঙ্কা করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, পরমাণু যুদ্ধের ফলে আবহাওয়ামণ্ডলে যে কার্বন অ্যারোসল কণা ছড়াবে, তাতে সুদূর যুক্তরাষ্ট্রেও এক দশক শস্যকণা ও সয়াবিনের উৎপাদন প্রায় ১০ শতাংশ কমে যাবে। এ কণার প্রভাবে চীনে প্রথম চার বছর গড়ে ২১ শতাংশ ও পরের ছয় বছর আরও ১০ শতাংশ ধানের উৎপাদন কমে যাবে। মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে গমের উৎপাদনও।

প্রতিবেদনের লেখক আইরা হেলফান্দ বলেন, ‘উন্নয়নশীল বিশ্বে ১০০ কোটি মানুষ মারা যাওয়া নিশ্চিতভাবেই মানব ইতিহাসের জন্য এক বিপর্যয়। এর সঙ্গে চীনের আরও ১৩০ কোটি মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়বে। এর যে ফলাফল আমরা পাব তা হলো, স্পষ্টতই একটি সভ্যতা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। অতএব ভারত-পাকিস্তান মুখে মুখে যতো হম্বিতম্বি করুক যুদ্ধ পর্যন্ত চাইলেই যেতে পারবে না।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা সারতাজ আজিজ বিবিসি উর্দুকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের সেনা ছাউনিতে হামলার পেছনে কারা জড়িত তা বের করতে আন্তর্জাতিক তদন্ত হওয়া দরকার। এই তদন্ত সম্পন্ন করার জন্য একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক কমিশন গঠন করতে হবে।

আজিজ বলেন, ভারতে কোনো হামলা হলে কোনো তদন্ত ছাড়াই ভারত সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানকে দোষারোপ করে থাকে। তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা পাকিস্তান বা ভারত কাউকেই লাভবান করবে না। অন্যদিকে ভারতে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত আবদুল বাসিত বলেন, পাকিস্তান ইতিবাচক ও গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। সম্প্রতি যে সংকট দেখা দিয়েছে, দুদেশ সেখান থেকে উত্তরণে মিলিতভাবে চেষ্টা করবে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তো আরও এক পা এগিয়ে শিক্ষা ও অভাব দূরীকরণের যুদ্ধের আহবান জানিয়েছেন পাকিস্তানকে।

মোটাদাগে বললে ১৯৪৭ সাল থেকে চারবার ভারত পাকিস্তান যুদ্ধে জড়িয়েছে। শুধুমাত্র ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে একবার যুদ্ধে জড়িয়েছিল ভারত-পাকিস্তান, বাকী তিনবারই কাশ্মীর দ্বন্দ্ব নিয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল প্রতিবেশী দুটি দেশ। ১৯৯৯ সালে কার্গিলে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় সৈন্য তুলে নিয়েছিল পাকিস্তান। এ ছাড়া আর কোন যুদ্ধই পাকিস্তানের জন্য সুখকর ছিল না।

এই ইতিহাস খুঁড়ে দেখার মূল কারণ উরি ঘটনার পর কিন্তু উরি হত্যাকাণ্ডের পর কেউ যদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠা অনলাইন সংবাদগুলো দেখেন মনে হবে ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ মনে হয় চলছে। ভয়ংকর সব শিরোনাম, যেমন “আজ রাতেই আক্রমণ”, ”ভারতের আকাশে পাকিস্তানের যুদ্ধ বিমান”, ”চীন সমর্থন করেছে পাকিস্তানকে”; ”রাশিয়ার সাথে যৌথ মহড়া”। নানা রকম চটকদার সব শিরোনাম। ছেলেবেলায় যারা বায়স্কোপ দেখেছেন তাঁদের মনে থাকার কথা সুর ধরে বায়োস্কোপওয়ালা যখন বলত ‘‘এই তারপরেতে আর কি আছে সাদ্দাম হোসেন আইসা গেছে, বুশ ব্যাটা পালাই গেছে’’ এ ধরণের সব শিরোনাম ।

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ দুই দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়, যদি ও প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসাবে আমরা চোখ কান খোলা রাখাই স্বাভাবিক। অবাক করার বিষয় হল চোখ কান এতো বেশী পরিমাণে খোলা যে বাংলাদেশ যেন অন্তর্জাল যুদ্ধেই জড়িয়ে গেছে। কেউ কেউ জরিপ করছেন বাংলাদেশ কোন দেশকে সমর্থন দিবে। কেউ কেউ আবার সমর্থন দিয়েও দিয়েছেন। মুসলিম রাষ্ট্র হিসাবে পাকিস্তানকে কেউ কেউ সমর্থন দিচ্ছেন। ভারতের চৌদ্দগোষ্ঠি উদ্ধার করছেন। আবার ভারতকে যারা সমর্থন করছেন তাঁরা ও পাকিস্তানের গোষ্ঠী উদ্ধার করছেন। মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদানের জন্য তাঁদের পক্ষে সাফাই গাইছেন।

বাংলাদেশ যখন বিশ্বের বুকে আপন মহিমায় উদ্ভাসিত, এক এক করে সাফল্যের পালক যুক্ত হচ্ছে দেশটির নামের আগে-পিছে। বাংলাদেশের যুদ্ধের একটি রক্তাক্ত বেদনাময় গৌরবের ইতিহাস আছে। দেশের নতুন প্রজন্ম নিশ্চয় যুদ্ধবিরোধী অবস্থানে থাকার মানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠবে; যুদ্ধের পক্ষে নিশ্চয় নয়। জাতিসংঘের সম্মেলনে যে দেশের প্রধানমন্ত্রী আমেরিকার মতো দেশের দিকে আঙুল তুলে বলতে পারেন, অস্ত্র ও অস্ত্রের উৎস বন্ধ করতে হবে। সেই অবস্থানটা বাংলাদেশের সর্বজনীন হওয়ার কথা ছিল।

শুভজিৎ ভৌমিক নামে একজনের “লস্ট জেনারেশন” নামে একটা লেখা পড়েছিলাম আজকেই। “লস্ট জেনারেশন” হচ্ছে, কোনো দুর্ঘটনার শিকার হয়ে হারিয়ে যাওয়া একটা সম্পূর্ণ প্রজন্ম। একটা মানুষ যখন মানসিকভাবে প্রাপ্তবয়স্ক হয়, অর্থাৎ ম্যাচিওরিটি লাভ করে, তখন তার মধ্যে রাজনীতি, সমাজ, পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন সমস্যা, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান এই সমস্ত ভাইটাল বিষয়ে সচেতনতা তৈরি হতে শুরু করে। মোটামুটি ১৮ থেকে ২৫ বছর – এই বয়সটাই নির্ধারণ করে দেয় যে, একটা মানুষ ভবিষ্যতে তার চারপাশ সম্পর্কে কতোটুকু সচেতন হবে, কনসার্নড হবে বা পৃথিবীর জন্য কতোটুকু অবদান রাখবে। এই সচেতন প্রজন্মটাই পরে দেশ চালায়, দুনিয়া চালায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে বিপুল সংখ্যক তরুণ-কিশোর-যুবক মারা গেলো। তৈরি হলো একটা প্রজন্মের শূন্যতা। সবাই মরে গেছে, কেউ বাকী নাই আর। তাহলে এখন দেশ চালাবে কে? এই যে একটা দুর্ঘটনায় একটা পুরো প্রজন্ম হারিয়ে গেলো, এরাই হলো: লস্ট জেনারেশন’’।

রক্তাক্ত যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশেই দেশের একটি প্রজন্ম যদি এখনো ভারতপন্থী, না পাকিস্তানপন্থী- এই বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে জরিপ করে তখন বুঝে নিতে হয় আমাদের মানসিক দীনতা ঠিক কোন পর্যায়ে। লস্ট জেনারেশন দিয়েই বুঝি চলছে বাংলাদেশ।

জুয়েল রাজ, ব্রিটেন প্রবাসী সাংবাদিক