সময়কে অতিক্রম করেছে যার নেতৃত্ব, ভুল হবেনা নিশ্চয়!

১৯৪৯ সাল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের বিশেষ কাউন্সিলসহ মোট ২৬টি কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৯টি ছিল নির্বাচনী কাউন্সিল। ২২ ও ২৩ অক্টোবর ২০১৬ কাউন্সিল হচ্ছে ২০তম নির্বাচনী কাউন্সিল।

১৯৭৪ সালের কাউন্সিলের পর এবারের কাউন্সিলই হয়তো আওয়ামী লীগ উৎসবের আমেজে উদযাপন করছে। ১৯৭৪ সালের ১৮-২০ জানুয়ারি তিন দিনব্যাপী কাউন্সিলে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন এ এইচ কামারুজ্জামান ও সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন তাজউদ্দীন আহমেদ।

১৯৭৫ সালের কালো অধ্যায় পেরিয়ে ১৯৭৬ সালে দল পুনরুজ্জীবনের পর মহিউদ্দীন আহমেদ ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী ছিলেন ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক।

দলটির জন্মলগ্ন থেকে বঙ্গবন্ধু ছিলেন প্রথম কমিটিতে যুগ্ম সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। এর পরের সব কমিটিতে বঙ্গবন্ধু সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর দক্ষ নেতৃত্বে অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

বিশ্বাসঘাতকতা আর ক্ষমতার লোভ সব তছনছ করে দিয়ে বাঙালির জীবনে আসে ৭৫-এর ১৫ আগস্ট। বিশ্বাস অবিশ্বাস ক্ষমতার মোহ নেতৃত্বের বদল সব দেখেছে আওয়ামী লীগ। শুধু বদলায়নি এর সমর্থক আর কর্মীরা। প্রান্তিক নেতাকর্মীরা দুর্দিনে বুক দিয়ে আগলে রেখেছে আওয়ামী লীগকে। ১৯৭৭ সালে বিশেষ অধিবেশনে আহ্বায়ক হয়েছিলেন তাজউদ্দীনের স্ত্রী, জোহরা তাজউদ্দীন।

১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের ১৮তম দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে আবার ও প্রাণ ফিরে পায় আওয়ামী লীগ। সভাপতি হিসাবে নির্বাচিত হন শেখ হাসিনা। সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন প্রয়াত আব্দুর রাজ্জাক। ৮২ সালে দল ত্যাগ করার পর সাজেদা চৌধুরী ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হন।

সেই থেকে শেখ হাসিনা হাল ধরে আছেন নৌকার। শেখ হাসিনা সময়কে অতিক্রম করে নিজেকে নিয়ে গেছেন নতুন উচ্চতায়। বাংলাদেশকে নিয়ে এসেছেন উন্নয়নের নতুন দিগন্তে।

বঙ্গবন্ধু ছাড়া যেমন স্বাধীনতা ও বাংলাদেশ চিন্তা করা যায় না। শেখ হাসিনা ছাড়া আধুনিক বাংলাদেশ ও চিন্তা করা যায়না।

আমি সব সময় একটা ঋণের কথা স্বীকার করি, মানবতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুধুমাত্র শেখ হাসিনার সুদৃঢ় নেতৃত্বের কারণেই সম্ভব হয়েছে। শেখ হাসিনার সব অর্জন বাদ দিলেও শুধুমাত্র এই একটি অর্জনের জন্য ইতিহাস শেখ হাসিনাকে অমর করে রাখবে।

কণ্টকাকীর্ণ পথ পেরিয়ে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগকে আজকের আওয়ামী লীগ করেছেন। বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ আর আজকের শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ এক নয়। বঙ্গবন্ধুর সাথে তখন যারা রাজনীতির মাঠে ছিলেন। নতুন জাতিসত্তার স্বপ্নে বিভোর একটা প্রজন্ম। যারা নিজের জীবন তুচ্ছ করে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সাথে একাত্ম করেছিলেন নিজেদের। জীবন দিয়ে সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগে সেই পরীক্ষিত নেতা দূরবীন দিয়ে খুঁজতে হয়।

চলছে আওয়ামী লীগের সম্মেলন, সভাপতি নিয়ে কোন মাথাব্যথা নেই, শেখ হাসিনা নিজেকে আকাশের সমান উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। সেই আকাশ ছোঁয়ার ক্ষমতা আওয়ামী লীগের কোন নেতারই হয়নি এখনো। সেই সম্ভাবনাও নিকট ভবিষ্যতে কেউ দেখেন না। কোটি কোটি কর্মী সমর্থকের ইচ্ছা শেখ হাসিনা বুঝেন। প্রান্তিক সেই নেতাকর্মীদের মনের ইচ্ছা শেখ হাসিনা খুব ভালোই অনুভব করেন এবং জানেন। সেই আস্থা ও বিশ্বাস থেকেই আজ তিনি শেখ হাসিনা হয়েছেন।

রাজনীতিতে চমক হিসাবে অনেক কিছুই আসে আবার হারিয়ে যায়। বিশাল বিশাল ছাত্রনেতা, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিত মুখ এমন অনেক নেতাই আওয়ামী লীগ থেকে ছিটকে পড়েছেন। রাজনীতিতে স্ট্যান্ডবাজী করে সাময়িক সময়ের জন্য প্রচারের আলোয় অনেকেই এসেছেন, কালের আবর্তে আবার হারিয়ে গেছেন। ইতিহাসের পাতায় আর খুঁজে পাওয়া যায়না তাঁদের।

আওয়ামী লীগের মতো বিশাল দলে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা থাকবেই। থাকাটাই স্বাভাবিক। আওয়ামী লীগের সম্মেলন মূলত সাধারণ সম্পাদক ঘিরেই আবর্তিত হয়। এবারের কাউন্সিল ও তাঁর ব্যতিক্রম নয়। গত কাউন্সিলের মতো এবারও সৈয়দ আশরাফ ও ওবায়দুল কাদেরকে নিয়ে চলছে রাজনীতিতে মেরুকরণ। এদের দুইজনের একজন হচ্ছেন সাধারণ সম্পাদক। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে মিডিয়া ওবায়দুল কাদেরকে সাধারণ সম্পাদক বানাতে এগিয়ে আছে। ওবায়দুল কাদেরের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ইতিহাস আছে। ৮০ পরবর্তী ছাত্র রাজনীতির কর্তাব্যক্তি তিনি। যার নির্দেশ ব্যতিত ছাত্রলীগের কোন কমিটি হয়নি। সারা দেশে তাই বিশাল কর্মী বাহিনী আছে উনার। কিন্তু ১/১১ এর পরীক্ষায় তিনি ফেল করেছেন।

আওয়ামী লীগের মতো বিশাল দলের দুই দুইবারের সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন সৈয়দ আশরাফ। যাকে আমি বলি রাজনীতির সন্ন্যাসী। ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকে ও যিনি সব লোভ লালসার ঊর্ধ্বে থেকে রাজনীতি করছেন।

রামের পাশে ভাই লক্ষণ হয়ে যিনি ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন। গণতন্ত্র ও সময়ের প্রয়োজনে সেই নেতৃত্বে পরিবর্তন আসতেই পারে। আসাই স্বাভাবিক। আওয়ামী লীগ কি আরেকজন সৈয়দ আশরাফ সৃষ্টি করতে পেরেছে। সৈয়দ আশরাফের মতো মানুষ অনেকেই বলেন আওয়ামী লীগের রাজনীতির জন্য ‘ফিট’ না। খুব জানতে ইচ্ছে করে কোন ধরনের নেতা আসলে আওয়ামী লীগের জন্য ফিট! ক্যামেরা, লাইট একশন বলে সিনেমা হয়, রাজনীতি নয়।

নতুন নেতৃত্ব আসুক তবে, বিশ্বাসের পরীক্ষায় যারা ফেল করেছেন একবার তাঁদেরকে সর্বোচ্চ নেতৃত্বে দেখতে চায়না প্রান্তিক মানুষ। এই দুইদিনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেটা বেশ ভালভাবেই বুঝা গেছে। ২৩ তারিখ বিকালেই জানা যাবে নবীন প্রবীণের সমন্বয়ে কে হচ্ছেন সাধারণ সম্পাদক।

আদার ব্যাপারীর যেমন জাহাজের খবর নেয়ার দরকার পড়ে না, তেমনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে কারা আসবেন সেটা আসলে আমাদের মতো মানুষের বিবেচ্য নয়। সম্মেলনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ দলীয় গঠনতন্ত্রে পরিবর্তন নিয়ে আসছে, যুদ্ধাপরাধী এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে জড়িত পরিবারের কোনো সদস্যকে আওয়ামী লীগের সদস্য না করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া দলের পদ-সংখ্যা বাড়ছে। সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদকসহ আটটি পদ বাড়ছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের প্রার্থী মনোনয়নে পৃথক বোর্ড গঠনের বিষয়টিও গঠনতন্ত্রে সংযোজনের প্রস্তাব করা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধী পরিবারের কোনো সদস্য আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্যও হতে পারবে না। একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে জড়িত পরিবারের কোনো ব্যক্তিও আওয়ামী লীগের সদস্য হতে পারবে না। দলের সম্মেলনে গঠনতন্ত্রে তা সংযোজনের প্রস্তাব করা হবে।

সাধারণ মানুষের এই আকুতি দীর্ঘদিনের ছিল। বঙ্গবন্ধুর দল, মুক্তিযুদ্ধের দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, সেই দলে যখন রাজাকার বা তাদের বংশধররা নেতৃত্ব দেয়। আওয়ামী লীগকে বুকে আগলে রাখা সাধারণ নেতাকর্মীরা কষ্ট পায়, অভিমানে দূরে সরে যায়।

আমার জন্মের সমান সময় ধরে তিনি দলটির সভাপতি হিসাবে পাড়ি দিয়েছেন। জেল, জুলুম, হত্যা চেষ্টা সব মোকাবেলা করে আওয়ামী লীগের যে ভিত্তি দাঁড় করিয়েছেন শেখ হাসিনা। পরামর্শ বা দাবী জানানো বাতুলতা ছাড়া কিছু নয়। নেতৃত্ব নির্বাচনে তিনি ভুল করবেন না নিশ্চয়!

জুয়েল রাজ, ব্রিটেন প্রবাসী সাংবাদিক