বিয়ানীবাজারের আইন শৃংখলা কতটুকু ভালো : দায় এড়াতে পারে না পুলিশ

//শরিফুল হক মন্জু //

বিয়ানীবাজারে ঘটে যাওয়া গত আট বছরের কোন ঘটনারই দায় এড়াতে পারেনা থানা পুলিশ। কারণ একের পর এক এসব ঘটনা ঘটেছে পুলিশের দৃষ্টি সীমার মধ্যে। এতে করে পুলিশের দায়িত্বশীলতা প্রশ্ন বৃদ্ধি হয়েছে কিনা জানি না। তবে নিরবতা, নিস্ক্রিয়তা অনেক কিছুরই আলামত বহন করে। পক্ষপাত দুষ্ট আচরণ দিয়ে আইন শৃংখলা রক্ষা করা কতটুকু সম্ভব। আইন শৃংখলা রক্ষায় পুলিশ প্রশাসনের কর্তব্য ও পেশাদারিত্বের মর্যাদা রক্ষায় কঠোর অবস্থানে থেকে নিরোপেক্ষ দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হয়। দলবাজ, দলকানা, ব্যক্তিঘেঁষা হয়ে পদন্নোতি পাওয়া গেলেও চৌকস ও দক্ষ কর্মকর্তার খ্যাতি অর্জন কতখানি সম্ভব। পেশাদারিত্বের সততা নিরোপেক্ষতাকে প্রশ্ন বৃদ্ধ করে দলবাজ পুলিশ কর্মকর্তারা বরাবরই নিন্দিত হয়েছেন।

কোনটি আমলযোগ্য অপরাধ। আর কোনটি আমলযোগ্য অপরাধ নয়। এই বিষয়টি কি? বিয়ানীবাজারের আইন শৃংখলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা পুলিশ প্রশাসন জানেনা। কোন অপরাধটি মানুষের জানমালের জন্য হুমকী। সাধারণ মানুষের মধ্যে আতংক ভয়ভীতি সৃষ্টি করে, আইন শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটনোর চেষ্টা কি? আমলযোগ্য অপরাধ নয়। প্রকাশ্যে দিবালোকে হাজার মানুষের সামনে মাইক বাজিয়ে, ট্রাকে করে মিছিল দিয়ে, আগুনে মানুষ পুড়িয়ে মারা ও সম্পদ হানির হুমকী কি আমলযোগ্য অপরাধের আওতায় পড়েনা। এতে কি আইন শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি হয়না।

বিয়ানীবাজার উপজেলার মানুষের জানমালের নিরাপত্তায় নিয়োজিত, বিয়ানীবাজার থানা পুলিশ- আমলযোগ্য অপরাধগুলো আমলে নিতে অনিহা কেন? পুলিশের এই দায়িত্বহীনতা পেশাদারিত্বের প্রতি অবহেলার কারণেই, অপরধীরা আস্কারা পাচ্ছে। আর এ কারণেই প্রকাশ্য দিনদুপুরে উগ্র সন্ত্রাসী চরিত্রধারণ করে, হুংকার তাণ্ডবের মহড়া মানুষকে মনে করিয়ে দিচ্ছে বিয়ানীবাজারের আইন শৃংখলা পরিস্থিতি ভালো নেই।

আইন শৃংখলা পরিস্থিতি কতটা ভালো। কতটুকু খারাফ তা বিয়ানীবাজারের মানুষ ভালো জানেন। গত আট বছর ধরে, বিয়ানীবাজারে ছাত্রলীগ কর্মীরা সহপার্টিদের ওপর হামলা করে মাটিতে ফেলে রক্তাক্ত করে, তখন ছাত্রলীগের রাজনীতির ঐতিহ্য পদদলিত হয় কি না। আর দলবাজ-দলকানা পুলিশ উল্লাসিত হয়। কর্মসততা, নিরোপেক্ষতাকে বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতার ডানপীটে থাকতে দলীয় কর্মীর ভূমিকায় যারা অবর্তীর্ণ হন, তাদের ব্যক্তিগত চরিত্র খারাপ না ভালো। সহপার্টি ছাত্রলীগ কর্মীরা যখন নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় তখন এক পক্ষের হয়ে পুলিশকে উপদলীয় ক্যাডারের চরিত্র ধারণ করলে সততা ও নিরোপেক্ষতা বিতর্কিত হয় কি না। শান্তি ও শৃংখলা রক্ষায় পুলিশের দায়িত্ব অপরিসীম। বিয়ানীবাজার থানা পুলিশ কি পারছে এখানকার শান্তি শৃংখলা রক্ষা করতে। একের পর এক সন্ত্রাসী হামলা অস্ত্রের মহড়ার পর বিয়ানীবাজারের আইন শৃংখলা কতটুকু ভালো। ছাত্রলীগের অভ্যন্তরিন কোন্দলকে কেন্দ্র করে গত সপ্তায় হামলা, পাল্টা হামলা, সংঘর্ষ, অস্ত্রের মহড়ার তান্ডবে উত্তপ্ত বিয়ানীবাজার উপজেলা শহর আতংকের শহরে জনপদে পরিণত হয়।

আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতারা গত আট বছরের এইসব ঘটনায় মর্মাহত হয়ে সহানুভূতি প্রকাশ করে স্বস্থির নিশ্বাস নিয়েছেন। কিন্তু ছাত্রলীগের নামে যারা অস্ত্রবাজি সন্ত্রাসী কর্মকান্ড করে দল ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করছেন তাদের আইনের হাতে তুলে না দিয়ে, আইনের শাসন প্রতিষ্টার স্বপ্ন দেখা কতটুকু যুক্তিযুক্ত। ব্যবসা প্রতিষ্টানে ঢুকে হামলার ঘটনায় ব্যবসায়ীরা পুলিশের ভূমিকাকে প্রশ্ন বৃদ্ধ করেছেন। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ পুলিশের উপস্থিতিতি ও পুলিশ পহরায় ছাত্রলীগ কর্মীরা দেশী-বিদেশী অত্যাধুনিক অস্ত্রের মহড়া তারা অতিতে কখনো দেখেনি। ছাত্রলীগ কর্মীদের অস্ত্রের মহড়ায় পুলিশের রহস্যজনক নিরবতা আইন শৃংখলা পরিস্থিতি অবনতি হয় কিনা?

বিয়ানীবাজার উপজেলার মুড়িয়া ইউনিয়নের সারপার এলাকার পাতারিপাড়া গ্রাম থেকে গত সোমবার ভোরে উঠতি রয়সি, রঙিন স্বপ্ন দেখা তরুণ, আব্দুল ওয়াহিদের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তার মৃত্যুর কারণটা এই মুহুর্তে আমার জানা নেই। তবে ক্ষতবিক্ষত লাশের ছবিতে ফুঁটে ওঠেছে নির্মম নিঃসংশ হত্যাকাণ্ডের বিভৎসতা। শরিরের সাতটি জায়গায় কুপ দিয়ে ঘাতকরা তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করেছে। ঘাড় ও হাতের সল্ড্যারে কুপগুলো জানান দিচ্ছে ঘাতকরা কতো নির্মম নির্দয় করুণ ছিলো। ওয়াহিদের হত্যা রহস্য কতটা উন্মোচিত হবে। তদন্ত কতটা সঠিক, নিরোপেক্ষ হবে। ঘাতকরা কবে লাগাত গ্রেফতার হবে। এই প্রশ্ন অনেকের মতো আমারও।

প্রায় দুই বছর আগে বিয়ানীবাজার পৌর শহরের দক্ষিনবাজারে রিজু নামের এক তরুণ ক্ষুদে ব্যবসায়ী ছাত্রলীগ নামধারী সন্ত্রাসীর বন্ধুকের গুলিতে নির্মম ভাবে খুন হয়। ওই ঘটনায় আসামীদের নাম ঠিকানাসহ থানায় মামলা হয়। সুনির্দৃষ্ট অলামত ও তথ্য প্রমানের ভিত্তিতে পুলিশ আদালতে চার্জশীট দাখিল করে। কিন্তু রিজু হত্যা মামলার প্রধান আসামী ছাত্রলীগের সাবেক আহবায়ক জামাল হোসেনকে রহস্যজনক কারণে এখনও পুলিশ গ্রেফতার করেনি। পুলিশের কাছে জামল পলাতক হলেও সে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে, তার রাজনৈতিক গুরু-শিষ্যদের কাছে। পুলিশের কাছে জামালের রাজনৈতিক পরিচয় সে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক আহবায়ক। খুনের মামলার ওয়ারেন্টভূক্ত পলাতক আসামী হিসেবে জামালের পরিচয় পুলিশের কাছে নগন্য। জামালের প্রতি পুলিশের খাতিরযত্ন, আদর সোহাগ, গোপন ফোনালাপের খবর এখন প্রকাশিত ! এখন কি? জবাব দিবে বিয়ানীবাজার থানা পুলিশ।

বিয়ানীবাজার থানা পুলিশ আইনের সেবক-রক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনে ব্যার্থতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে বলে, বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ ওঠেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষের ক্ষুব-বিক্ষুভ, অগ্নিমূর্তিধারণ করা সন্ত্রাসীদের স্তিরচিত্রসহ সাধারণ মানুষের অভিযোগগুলো প্রকাশ পেয়েছে। আর আমাদের পুলিশ প্রশাসন মানুষের জানমালের নিরাপত্তায় আইন প্রয়োগের বিষয়টি বেমালুম ভুলে গেছেন। মানুষের নিরাপত্তা ও আইন শৃংখলা রক্ষায় পুলিশ আইন প্রয়োগ যেমন করছে না। ঠিক তেমনি আইন আদালতের আদেশ নির্দেশ, নির্দেশনার প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন করছেনা।

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) আন্তঃ জেলা পরিবহন চলাচলের নীতিমালা অনুসরণ ও আইন প্রয়োগ না করে থানা পুলিশ এবং ট্রাফিক পুলিশ প্রতিদিন অর্ধ লাখ টাকার চাঁদার হিসাব মেলাকে ব্যস্ত। প্রতিনিয়ত চাঁদাবাজির টাকার হিসাব মেলাতে গিয়ে বিয়ানীবাজার উপজেলা দিয়ে অন্য জেলার (সিএনজি) অটোরিক্সা চলাচলের সুযোগ করে দিচ্ছেন। জনস্বার্থে একটি কথা বলতেই হয়, যদি বিয়ানীবাজার শহরে সব ধরনের রিক্সা চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তাহলে সিএনজি চালকরা লুঠপাট আর মগেরমুল্লুকে পরিণত করবে বিয়ানীবাজার পৌর শহর ও শহর এলাকায়। বিধায় জনগুরুত্ব বিষয়টিকে, গুরুত্বসহকারে জরুরী বিত্তিতে উপজেলা প্রশাসনের নজরে নিয়ে আসা দরকার।

লেখক : শরিফুল হক মন্জু, প্রবাসী সাংবাদিক, সাবেক বিয়ানীবাজার প্রতিনিধি দৈনিক যুগান্তর ।