স্যারের কিনে দেয়া জমিতে ঘর তুলবেন বাজনদার

বেশ কয়েকটি অস্ত্রোপচারের পর এখন অনেকটা সুস্থ ‘বৃক্ষমানব’ পরিচিতি পাওয়া আবুল বাজনদার। তবে রোগটা জিনগত বলে এটি আবার ফিরে আসতে পারে। তাই তাকে দীর্ঘমেয়াদে পর্যবেক্ষণে রাখতে চায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট। কাছে রেখে চিকিৎসা দেয়ার জন্য বাজনদারকে চাকরি দেবে কর্তৃপক্ষ।

বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনিস্টিটিউটের কাজ চলছে। সেখানেই চাকরি মিলবে আবুল হোসেন বাজনদারের।

অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে হাতের ‘শিকড়-বাকড়’ ফেলে দেয়ার পর ক্ষত অনেকটা শুকিয়েছে। কিন্তু হাসপাতাল থেকে তাকে আপাতত ছাড়ছে না কর্তৃপক্ষ। তাদের আশঙ্কা, চিকিৎসার ফলোআপের জন্য যদি আর না আসেন বাজনদার! মাকে নিয়ে বাজনদার এখনো হাসপাতালেই আছেন।
বৃহস্পতিবার দুুপরে এই প্রতিবেদক যান বাজনদারের সর্বশেষ অবস্থা জানতে। প্রতিবেদকের বয়ান: তখন ঠিক দুইটা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের পঞ্চম তলার ৫১২ নম্বর রুমের দরজার কড়া নাড়তেই খুলে দিলেন বাজনদারের বৃদ্ধা মা আমেনা বেগম।

হাসিমুখে কুশল জানতে চাইলেন। আবুল বাজনদার তখন নিজে নিজে শার্ট গায়ে দিচ্ছেন। আমেনা খাতুন ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোর যেদিন প্রথম অপারেশন হয়, সেদিন তোর এই ভাইও আমার কাছে ছিল।’

শার্ট গায়ে চড়িয়ে বিছানায় বসেন বাজনদার। প্রায় দেড় বছর আগে এখানে ভর্তি হয়েছিলেন বিরল রোগ ‘ট্রি ম্যান সিনড্রোম’ নিয়ে। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে নানা চিকিৎসার ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। এখন তার হাত অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে।

এই চিকিৎসার ভেতর দিয়ে আর কত দিন যেতে হবে, চিকিৎসকরা বলছেন কি না জানতে চাইলে বাজনদার বলেন, ‘ওভাবে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলেনি। তবে তারা আমাকে সব সময় পর্যবেক্ষণে রাখতে চান বলে জেনেছি।’

আবুল বাজনদার বলেন, ‘আমাদের যখন ছুটি দেবে, যাওয়ার আগে আপনাদের সাংবাদিক ভাইদের জানিয়ে যাব।’

কথায় কথায় জানতে চাওয়া হয় বাড়িতে গিয়ে কী করবেন বাজনদার। তিনি বলেন, ‘একজন স্যার একখ- জমি কিনে দিয়েছেন। ওই জমির ওপর ঘরবাড়ি তুলে বসবাস করব। আর কোনো কাজকর্ম করেই বাকি জীবন চলে যাবে ইনশাহ আল্লাহ।’

আর যদি চাকরি পান? এখানকার বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক ইউস্টিটিউটে আপনাকে চাকরি দেয়া হবে বলে চিকিৎসকদের মাধ্যমে জানা গেছে। জবাবে আবুল বাজনদার বলেন, ‘একটি চাকরি পাওয়া তো খুব ভালো কথা। এ ব্যাপারে পত্রিকায় লেখালেখি হয়েছে বলে শুনেছি। তবে চাকরির কোনো খবর আমাকে কেউ বলেনি।’

যুক্তরাষ্ট্রের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলছে, খুলনার আবুল বাজনদারের হাতে ও পায়ে গাছের শিকড়ের মতো দেখতে শক্ত চামড়ার কারণ জিনগত ত্রুটি। এ কারণে অস্ত্রোপচার করা স্থানে আবার শিকড় দেখা দিতে পারে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ চায় বাজনদারকে কাছে রেখে চিকিৎসা করতে। তাই তাকে ঢাকা মেডিকেলে চাকরি দিয়ে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখতে চায়।

আবুল বাজনদারের চাকরির বিষয়ে জানতে চাইলে বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক ইউনিটের প্রধান মো. আবুল কালাম মুঠোফোনে ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘আগামী বছর বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনিস্টিটিউট চালু হচ্ছে। সেখানে আবুলের একটি চাকরির ব্যবস্থা করেছি।’ বাজনদার এখন অনেকটাই সুস্থ হয়ে গেছে এবং  তাকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।

অধ্যাপক আবুল কালাম আরো বলেন, ‘আবুল বাজনদারের রোগের মূল কারণ জানতে তার রক্তের নমুনা যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়েছিলাম। তার ফলাফল আমরা পেয়েছি। এতে দেখা গেছে, জিনগত ত্রুটির কারণে এ রোগ হয়েছে তার।’

২০১৬ সালের ৩০ জানুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে ভর্তি হন বাজনদার। তার হাতে ও পায়ে তখন শিকড়ের মতো মাংস ঝুলছিল। এটি ‘এপিডার্মোডিসপ্লাসিয়া ভেরাসিফরমিস’ নামের রোগ বলে শনাক্ত করেন চিকিৎসকরা। রোগটি ‘ট্রি ম্যান’ (বৃক্ষমানব) সিনড্রোম নামে পরিচিত।

এরপর বাজনদারের চিকিৎসায় ছয় সদস্যের মেডিকেল বোর্ড গঠন করে ঢাকা মেডিকেল। এই রোগের কারণ জানার জন্য ঢাকা মেডিকেল আবুলের রক্তের নমুনা গত বছরের মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের নরিস কম্প্রিহেনসিভ ক্যানসার সেন্টারে পাঠায়। নমুনা পাঠাতে সহায়তা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সম্প্রতি সেই নমুনা পরীক্ষার ফলাফল ঢাকা মেডিকেলে এসেছে।

এর আগে ঢাকা মেডিকেলের চিকিৎসকরা আবুলের হাতের তালু, পায়ের পাতা এবং হাত-পায়ের আঙুলে ২০টির বেশি ছোট-বড় অস্ত্রোপচার করেন। আবুলের চিকিৎসার সব খরচ বহন করছে সরকার।