ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালত আছে, প্রাণ নেই

শিপার আহমেদ ::

বিয়ানীবাজারের কোথাও গ্রাম আদালত পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না । আগেকার আমলের নিয়মেই চলছে ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের সামাজিক সালিশ বিচার ও এ সংক্রান্ত অন্যান্য কার্যক্রম। এখানকার ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালতে যেন প্রাণ নেই । অথচ প্রতিটি ইউনিয়নে গ্রাম আদালত চালু করতে ২০০৬ সালের ৯ মে এ আইন পাস করা হয়। এ আইনে ইউপি চেয়ারম্যানদের ফৌজদারি ও দেওয়ানি আইনে বিচারের আওতা ভাগ করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু ১১ বছরেও এ আইন সেভাবে কার্যকর হয়নি। ইউএনডিপি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের আর্থিক সহযোগিতায় ৩৩৮টি ইউনিয়ন পরিষদে গ্রাম আদালত কার্যকর করতে ‘অ্যাকটিভ ভিলেজ কোর্টস ইন বাংলাদেশ’ নামে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ২০০৯ সালে শুরু হওয়া ৫ বছর মেয়াদি এ প্রকল্প চলে ২০১৩ সাল পর্যন্ত। বিশেষ এই বিধিমালার নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে এলেও উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম সম্পর্কে সাধারণ মানুষ তেমন অবগত নয়। সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যানদের কাছে গ্রাম আদালত গঠন করে শ্রেণী ভেদে ফৌজদারী ও দেওয়ানী মামলা নিষ্পত্তির ক্ষমতা দেয়া হলেও ইউপি চেয়ারম্যানরা এই ক্ষমতাকে প্রয়োগ করছেন না। ফলে সামাজিকভাবে বাড়ছে নানা অপরাধের বিস্তৃতি। তবে গ্রাম আদালতের বিষয়ে জানতে চাইলে কুড়ার বাজার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এ.এফ.এম আবু তাহের বিয়ানীবাজারকণ্ঠকে জানান, আমরা সামাজিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করি না। সামাজিকভাবেই সমাধানের চেষ্টা করা হয়।

মন্ত্রণালয় বিভিন্ন সূত্রে নিশ্চিত হয়েছে, এসব ইউনিয়ন পরিষদে গ্রাম আদালতের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হচ্ছে না। কিন্তু গ্রাম আদালত কার্যকর না হওয়ায় গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গ্রাম আদালতের আওতাভুক্ত অপরাধের ঘটনা বিচারের জন্য চলে যাচ্ছে থানা পুলিশ ও নিয়োগ আদালতে। গ্রাম আদালতের অপরাধ সংশ্লিষ্ট দণ্ডবিধির সঙ্গে অন্য দণ্ডবিধি যুক্ত করে থানা ও আদালতে মামলা দায়ের করা হয়।

জানা গেছে, গ্রাম আদালত আইনের ৩ ধারায় বিচারযোগ্য মামলা, ৪ ধারায় আদালত গঠনের আবেদন, ৫ ধারায় গ্রাম আদালত গঠন, ৬ ধারায় গ্রাম আদালতের এখতিয়ার ও ৭ ধারায় গ্রাম আদালতের ক্ষমতার বর্ণনা দেয়া আছে। গ্রাম আদালত আওতাভুক্ত ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদানের আদেশ দিতে পারবে। দণ্ডবিধির ৩২৩, ৪২৬, ৪৪৭, ১৪৩, ১৪৭, ১৪১, ১৬০, ৩৩৪, ৩৪১, ৩৪২, ৩৫২, ৩৫৮, ৫০৪, ৫০৬, ৫০৮, ৫০৯, ৫১০, ৩৭৯, ৩৮০, ৩৮১, ৪০৩, ৪০৬, ৪১৭, ৪২০, ৪২৭, ৪২৮ ও ৪২৯ ধারায় কেউ অপরাধ করলে গ্রাম আদালত বিচার করতে পারবে। তবে প্রতিটি ধারার ক্ষেত্রে শাস্তি হিসেবে জরিমানার পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা আদায়ের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। দেওয়ানি মামলার মধ্যে কোন চুক্তি, রসিদ বা অন্য কোন দলিল মূলে পাওনা অর্থ আদায়, কোন অস্থাবর সম্পত্তি পুনরুদ্ধার বা এর মূল্য আদায়, স্থাবর সম্পত্তি বেদখল হওয়ার এক বছরের মধ্যে পুনরুদ্ধার, গবাদিপশু অনধিকার প্রবেশে ক্ষতিপূরণ আদায়, কৃষি শ্রমিকের মজুরি ও ক্ষতিপূরণ আদায়ের মামলা করা যাবে। গঠিত আদালতের প্রধান হবেন চেয়ারম্যান। বাদী ও বিবাদী কর্তৃক দু’পক্ষ থেকে মনোনীত ২ জন করে ৪ জন ইউপি সদস্য হবেন আদালতের সদস্য। এ পাঁচ সদস্যের গ্রাম আদালত শুনানি করে বিচার করবে। তবে কোন অবস্থাতে এ আদালত সালিশ ও ফতোয়ার নামে কোন বিচার করতে পারবে না। এককথায় গ্রাম আদালতের বাইরে ইউপি চেয়ারম্যান বা ইউপি সদস্যরা অন্য কোন ফৌজদারি ও দেওয়ানি অপরাধে বিচার করতে পারবেন না।
এদিকে গ্রাম আদালত কার্যকর না করলে ইউনিয়ন পরিষদে সরকারি বরাদ্দ দেয়া হবে না। একই সঙ্গে ইউপি চেয়ারম্যানদের কাজের মূল্যায়ন করে বিশেষ অনুদান দেয়া হবে। এজন্য ১০০ নম্বরের একটি মানদণ্ড প্রণয়ন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে খসড়া প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হয়েছে। শিগগির এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে পরিপত্র জারি করা হবে।

এ প্রসঙ্গে বিয়ানীবাজার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানআতাউর রহমান খান বলেন, গ্রাম আদালত কার্যকর থাকলেও বিজার কার্য কম পরিচালিত হয়। এখানে বিচার কাজ সামাজিকভাবে শেষ হয়। তবে এসব প্রথা থেকে সাধারণ মানুষ শীগ্রই বেরিয়ে আসাবে।