সিলেটে দিনমজুর আন্দোলন

কমরেড অজয় ভট্টাচার্য

ত্রিশের দশকের শেষ দিক। ১৯৩৮-৩৯ সাল, সারা দেশে খেটে খাওয়া মানুষের চিন্তা চেতনা যখন অনেকখানি এগিয়ে চলেছে, তখন শ্রমিক কৃষক সমাজের একেবারে পিছিয়ে পড়া অংশের মধ্যেও জাগরণের লক্ষণ দেখা যায়। সিলেট জেলায় কৃষক ও চা বাগান শ্রমিকদের ভেতর সংগ্রাম ও সংগঠন অনেকখানি এগিয়ে গিয়েছে। জেলার কৃষক-প্রজা সমাজ, সরকার ও জমিদারদের বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছে জমির ওপর স্থায়ী স্বত্বাধিকার দাবি করে। আর চা বাগান শ্রমিকরা সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির দাসত্ব শৃঙ্খল ছিড়ে বেরিয়ে আসতে বাগানে বাগানে জীবন-পণ সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েছে। তারই প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে সিলেট শহরের বহিরাগত মালটানা দিনমজুরদের ওপর। শহরের নিকটবর্তী চা বাগান মালনীছড়া, লাক্কাতুরা, খাদিম নগর, কালাগুল। ওখান থেকে শ্রমিকরা মিছিল করে শহরে এসেছে তাদের দাবি দাওয়ার কথা দেশবাসীকে জানাতে। মালনীছড়ায় তো স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মঘট হয়ে গেছে বেশ ক’দিন ধরে। সিলেট শহরের দিনমজুরদের মতো চা বাগানের শ্রমিকরাও বহিরাগত। তারা উভয়েই হিন্দিতে কথা বলে। একে অপরের কথা সহজেই বুঝে নিতে পারে। ভাষার এ সমতা তাদের পরস্পরকে কাছে টেনে নেয়। শহরে চা বাগান শ্রমিকদের মিছিল দেখে দিন মজুররা উদ্বুদ্ধ হন।
সিলেট শহরে দিনমজুরদের সংখ্যা তখন শ’তিনেক। তাঁদের সঙ্গে আছেন রেল কোম্পানি ও জাহাজ ঘাটার আর শ’খানেক এমনই মাল টানা শ্রমিক এ শহরে। সবাই তারা ভারতের বিহার প্রদেশের বাসিন্দা, স্থানীয়ভাবে তারা দেশোয়ালী বলেই সমধিক পরিচিত। রুটি রুজির সন্ধানে দেশ ছেড়ে তারা এসে পড়েছেন এই দূর দেশ সিলেটে। এখানে নিঃসঙ্গ প্রবাস জীবনে যা তারা উপার্জন করেন তা থেকে খেয়ে পরে দু’পয়সা বাঁচিয়ে রাখার উপায় নেই কারো। এ আয়ে দিনে দু’বেলা পেট পুরে খেয়ে বাঁচাই যেন দুঃসাধ্য এ মাগ্নিগ-ার দিনে। এ অবস্থায় দেশে ফেলে আসা স্ত্রী পুত্র কন্যার জন্য যা মাসোহারা পাঠাবার কথা তা কোন দিনই তারা পাঠাতে পারেন না। তাই মনের দুশ্চিন্তাও কোন দিন ঝেড়ে ফেলতে পারেন না। এ অবস্থার প্রতিকার কেউ দেখতে পায় না।
এবার সিলেট শহরে চা বাগান শ্রমিকদের মিছিল দেখে তাদের মনের অবস্থা যেন পাল্টে যায়। সত্যি সত্যি তারা কী চান তা জেনে নিতে দিন মজুররা চা বাগান শ্রমিকদের দলে গিয়ে ভেড়েন। এ মেলা মেশায় দিন মজুররা চা বাগান শ্রমিকদের মজুরির লড়াইয়ের কথা শোনেন। উপলব্ধি তাদের এক পা এগিয়ে যায়।
সুরমা নদীর তীরে সিলেট শহরের অন্যতম ব্যবসা কেন্দ্র কালীঘাট অঞ্চলে তখন এই সব বহিরাগত দিন মজুরদের আস্তানা। ওখানে খোঁজ করে তাঁরা শ্রমিক আন্দোলনের সাথে সম্পর্কিত এক ব্যক্তিকে আবিষ্কার করে ফেলেন। এই ব্যক্তিটি আর কেউ নন, তিনি হলেন এই অঞ্চলে সবার পরিচিত এক দোকান কর্মচারী। নাম তার অশ্বিনী দেব। কালীঘাট বাজারে এক ছোট মুদির দোকানে চাকরি করলেও তিনি শহরের বহু জনহিতকর প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত থেকে সর্বদাই এই অঞ্চলের অভাব অভিযোগ নিয়ে তাঁদের কাছে যেতেন। কালীঘাটের সবাই তাকে জনদরদী বলে জানতো। তাঁর এই জনহিতকর কাজের পেছনে ছিল আসলে তার রাজনৈতিক বিশ্বাস ও সাংগঠনিক যোগাযোগ। কিন্তু এদিকটা ছিল তখন চাপা। কারণ তিনি ছিলেন তখনকার বেআইনি ঘোষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির একজন কর্মী, যা জনসম্মুখে প্রচার করার উপায় ছিল না। তার প্রয়োজনও ছিল না, নীরবেই তিনি কালীঘাট অঞ্চলে গরিব জনতার মধ্যে তার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে রেখেছিলেন। কালীঘাটের দিনমজুররা তাকে গরিবের বন্ধু বলে জানতেন। এবার তারা জানতে পারলেন যে, তিনি চা বাগান শ্রমিকদের ইউনিয়নের সাথেও যুক্ত। তাই চা বাগান শ্রমিকদের ইউনিয়নের সাথে পরিচয় করতে তারা তাকে গিয়ে ধরলেন।
সিলেট শহরের জিন্দাবাজার অঞ্চলে চা বাগান মজদুর ইউনিয়নের অফিস। দিনমজুরদের সর্দার মহাদেব গোয়ালাসহ তাদের কয়েকজন লোক নিয়ে অশ্বিনী দেব সেই অফিসে গিয়ে উঠলেন। অফিসে তখন চা বাগান মজদুর ইউনিয়নের নেতা দ্বিগেন দাসগুপ্তসহ বহু কর্মী উপস্থিত ছিলেন। তারা সবাই দিনমজুরদের সাথে আলাপ আলোচনা করলেন। এখানেই ঠিক হলো যে, চা বাগান মজদুর ইউনিয়নের কর্মীদের নিয়ে দ্বিগেন দাসগুপ্ত দিনমজুরদের মধ্যে ইউনিয়ন গড়ে তোলার কাজে উদ্যোগ নেবেন। এ কাজে অশ্বিনী দেবও তার সাথী হলেন।
সিলেট শহরে এই দিনমজুদের অবস্থা ছিল খুবই করুণ। কালীঘাট অঞ্চলে তারা থাকতেন বটে তবে থাকার স্থান ছিল তাদের গাছতলা বা পথের ধারে খালি জায়গা। রাতের বেলা ওখানে চাটাই বিছিয়ে তারা কোন রকম পড়ে থাকতেন। মাথার ওপর কারো কোন আচ্ছাদন থাকতো না। ঝড় বৃষ্টি হলে দোকানের বারান্দায় বারান্দায় তাদের কোন রকমে জড়সড় হয়ে বসে থাকতে হতো। মজুরিও ছিল তাদের কেবল নামমাত্রই। অথচ এইসব দিন মজুর ছাড়া সিলেটের ব্যবসা বাণিজ্য অচল হয়ে পড়তো। চাটগাঁ, ভৈরব বাজার ও কলকাতার সাথে রেলে স্টিমারে সরাসরি যুক্ত সিলেটের ব্যবসা বাণিজ্য দিন মজুরদের মাথায় করে মালামাল টানতে হতো অমানুষিক পরিশ্রম করে। কিন্তু তার জন্য তারা যে হারে মজুরি পেতেন তা ছিল তখনকার দিনেও প্রায় অবিশ্বাস্য রকমে কম। মাথায় বয়ে নদীর গর্ভ থেকে উঁচু পাড় ভেঙ্গে উপরে মাল তোলার মজুরি ছিল তখন মন প্রতি এক পয়সা। মালামাল বহনের অন্যান্য ক্ষেত্রে মজুরি ছিল এমনই সামান্য। তাই সিলেট শহরে দিনমজুরদের অবস্থা তখন কেমন ছিল তা আর বর্ণনা করে বোঝাবার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না।
এই অবস্থায় মজুরির লড়াইয়ে মজুরদের সংঘবদ্ধ করতে আর খুব বেশি বেগ পাবার কথা নয়। জিন্দাবাজারস্ত চা বাগান মজদুর ইউনিয়নের অফিসে আলাপ আলোচনার পর দ্বিগেন দাসগুপ্ত ও অশ্বিনী দেবের উদ্যোগে ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী সুধাংশু ঘোষ ও শহরের বামপন্থী কর্মী কেশব দাস, বিনোদ বন্ধু সেন, বিনয় গাঙ্গুলী প্রমুখের চেষ্টায় দিনমজুরদের সংগঠন গড়ে উঠলো। সংগঠনের দাবিগুলো হলো
(১) নদীর ঘাট থেকে মাল তোলার মজুরি মন প্রতি এক পয়সার স্থলে দুই পয়সা করতে হবে।
(২) অন্যান্য ক্ষেত্রেও মজুরি এভাবে দ্বিগুণ হবে।
(৩) মহাজনদের গুদামে মজুরদের রাত্রিবাসের স্থান করে দিতে হবে ইত্যাদি।
এই দাবিগুলোর ওপর ভিত্তি করে ১৯৩৯ সালের প্রথম দিকে সিলেটের ‘সারদা মেমোরিয়াল হলে’ দিনমজুরদের এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে সিলেট দিনমজুর ইউনিয়ন নামে এক ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন গড়ে তোলা হয়। ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হন মহাদেব গোয়ালা, সহ-সভাপতি দিন দয়াল তেলি, সম্পাদক অশ্বিনী দেব। দিন মজুরদের ভিতর থেকে আরও জনাকয়েক সদস্য নিয়ে কার্য নির্বাহক কমিটি গঠিত হয়। ট্রেড ইউনিয়ন আইন অনুসারে এই ইউনিয়নটি আসামে রেজিস্ট্রেশন করে নেওয়া হয়।
ইউনিয়ন গঠনের কাজ সম্পূর্ণ হয়ে গেলে নেতারা দিন মজুরদের দাবি দাওয়া নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ আলোচনায় যান। আলোচনার সূত্রপাতেই দেখা যায় শহরের বড় বড় ব্যবসায়ীরা দাবি দাওয়া বিবেচনা করা দূরে থাক কেউ যেন তা শুনতেই রাজি নয়। দিন মজুর ইউনিয়নের সমর্থক শহরের বামপন্থী কর্মীদের বিরুদ্ধেও তারা ঢালাও মন্তব্য করতে থাকেন। বামপন্থী কর্মীরা এই অবস্থায় অসহায় দিনমজুরদের দাবি দাওয়ার প্রতি জোর সমর্থন নিয়ে আরও বিপুল সংখ্যায় এগিয়ে এলেন। তাদের সহযোগিতায় শহরে দিন মজুরদের দাবি দাওয়ার সমর্থনে বড় বড় সভা মিছিল অনুষ্ঠিত হতে থাকে। মধ্যবিত্ত সমাজসহ শহরের খেটে খাওয়া বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ এসব সভায় ও মিছিলে ব্যাপকভাবে যোগ দিয়ে দিনমজুরদের দাবিগুলোর পক্ষে তাদের সমর্থন প্রকাশ করেন। কিন্তু শহরের ব্যবসায়ী সমাজ তা মেনে নিতে সম্মত হয় না। ফলে মজুরদের ভিতর অসন্তোষ কেবল বাড়তেই থাকে।
এ অবস্থায় ইউনিয়নের পক্ষে সক্রিয় সংগ্রামের পথ বেছে নেওয়া ছাড়া টিকে থাকবার আর কোন উপায় থাকে না। ইউনিয়ন অবশেষে তাই করে। নিজেদের ভেতরে ব্যাপক আলাপ আলোচনার পর তারা ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নেন। ট্রেড ইউনিয়ন আইনের বিধান মতো ইউনিয়ন প্রতিপক্ষকে এক মাসের নোটিশ দিয়ে ধর্মঘটের কথা জানিয়ে দেয়। নোটিশ পেয়েই মহাজনরা সর্বপ্রথম টাকা পয়সা ছড়িয়ে এবং ভয় দেখিয়ে ইউনিয়নের পেছন থেকে মজুরদের সরিয়ে আনবার চেষ্টা করেন। কিন্তু মজুরদের ভিতরকার ঐক্য এবং ইউনিয়নের প্রতি তাদের আনুগত্য এমনই নিরেট ছিল যে, শত চেষ্টা করেও মহাজনেরা তাদের ভেতর থেকে একটি লোককেও দল ভাঙ্গিয়ে আনতে পারেনি। অবশেষে মাস পার হয়ে গেলে বিরাট উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যে সিলেট শহরে দিনমজুরদের সর্বাত্মক ধর্মঘট আরম্ভ হয়।
ধর্মঘট হওয়ার পর পরই দেখা গেল সিলেট শহরের ব্যবসা বাণিজ্য একেবারে অচল হয়ে পড়েছে। রেল স্টেশন ও স্টিমার ঘাটে আমদানি রপ্তানির মালামাল একেবারে স্তূপাকারে পড়ে থাকে, কেউ তাতে হাতও লাগায় না। ব্যবসা কেন্দ্রগুলোতে মালের চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ঠেলা ও গরুর গাড়িগুলোকে আর আড়তের পথে সারি বেধে চলতে দেখা যায় না। বাইরের ব্যবসায়ীরা এসে মাল সরাবার ব্যবস্থা নেই দেখে দোকানে দোকানে মালপত্র দামদর করেও কেবল হাতে করে নেবার মাল ছাড়া আর কিছুই ক্রয় করতে চায় না। মহাজনরা তবু মজুরদের দাবি দাওয়া বিবেচনা করতে রাজি হয় না। ১৯৩৯ সালের এপ্রিল মাসে আরম্ভ হয়ে এ ধর্মঘট পুরো একটা মাস ধরে চলতে থাকে।
অবশেষে কেবল সিলেট শহরেই নয় জেলার সর্বত্র যখন বাজারে বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় মালপত্রের ঘাটতির ফলে দ্রব্যমূল্য অবিশ্বাস্য রকম বেড়ে যেতে আরম্ভ করে তখন সিলেট শহরের মহাজনদের প্রতি বিভিন্ন স্থানে জনতার ভিতর বিরূপ মনোভাব প্রকাশ পেতে থাকে। ফলে সিলেট শহরের ব্যবসায়ী সমাজের দীর্ঘকালের সুনাম নষ্ট হবার উপক্রম হলে একাংশ ব্যবসায়ীর মনোভাব খানিকটা পাল্টে যেতে থাকে। সিলেট শহরে ব্যবসা বাণিজ্যে ছোট ও মাঝারি আকারের পুঁজির মালিকানা তখন স্থানীয় লোকের হাতে থাকলেও অপেক্ষাকৃত বড় পুঁজির বিশেষ করে আমদানি রপ্তানির ক্ষেত্রে বহিরাগত মাড়োয়ারি পুঁজিই প্রাধান্য বিস্তার করেছিল। এসব মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীদের কারবার কেবল সিলেট শহরেই নয়, আজমিরিগঞ্জ, ভৈরব বাজার এবং কলকাতার মতো স্থানেও চালু ছিল। ঐসব স্থানের সঙ্গে সিলেটের ব্যবসায়ের বিশেষভাবে মাড়োয়ারি মহাজনদের ব্যবসাগত ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। তাই দিন মজুরদের ধর্মঘটের ফলে সিলেটের ব্যবসা বাণিজ্য প্রায় অচল হয়ে পড়লে বাইরের ব্যবসা কেন্দ্রগুলোতেও তার প্রতিক্রিয়া ঘটতে থাকে। সিলেটের মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীরা দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির আশঙ্কা করতে থাকে। এ অবস্থায় তারা অগ্রণী হয়ে শহরের অপরাপর ব্যবসায়ীদের প্রভাবিত করে মাসাধিক কালের এই মজুর ধর্মঘটের মীমাংসার জন্য চেষ্টা শুরু করেন। তাদের চেষ্টায় ফল হয়। শেষ পর্যন্ত সিলেটের বণিক সমিতি মজুরদের দাবি দাওয়াগুলোর আংশিক স্বীকৃতি দিতে সম্মত হয়ে যায়। মজুর ইউনিয়নের দ্বিগুণ মজুরি বৃদ্ধির দাবিকে তারা দেড়গুণে নামিয়ে আনেন। অর্থাৎ নদীর ঘাট থেকে তীরে মাল তুলে আনার ক্ষেত্রে প্রচলিত মন প্রতি এক পয়সার স্থলে তারা দেড় পয়সা দিতে রাজি হয়ে গেলে ইউনিয়নও মীমাংসায় সম্মত হয়ে যায়। সর্বক্ষেত্রে একই হারে মজুরি বৃদ্ধি, মহাজনদের সাধ্যমত মজুরদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দেবার অঙ্গীকার এগুলো হয় মীমাংসার শর্ত।
উভয় পক্ষে এভাবে আপোসের শর্তগুলো স্বীকৃত হয়ে গেলে এক প্রকাশ্য জনসভায় তা উপস্থাপন করে তার প্রতি জনসমর্থন আদায় করা হয়। অবশেষে মহাজনদের প্রতিনিধি স্থানীয় ব্যক্তিদের সাথে মজুর ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের স্বাক্ষরিত এক লিখিত চুক্তি বলে সিলেট শহরের এই দিনমজুর ধর্মঘট ১৯৩৯ সালের মে মাসের প্রথম দিকে শেষ হয়। পরবর্তিকালে মহাজনেরা যেমন এই চুক্তি মেনে চলেন, তেমন দিনমজুরদের পক্ষ থেকেও চুক্তির শর্তাবলীর ওপর তীক্ষè নজর রাখা হয়। ফলে মহাজনদের কথামত মজুরদের বাসস্থানের ব্যবস্থা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মহাজনেরাই করে দেয়।
শহরের দিনমজুরদের এই আন্দোলনের সাথে রেল ও স্টিমার ঘাটের মজুররাও জড়িত ছিলেন। তাঁদের সবার কাজের ধারা মোটামুটি একই ছিল এবং কেবল শ্রেণীগতভাবেই নয়, জাতীয়তার ভিত্তিতেও তারা সবাই ছিলেন একই গোত্রীয়। অর্থাৎ এেেদশে দেশোয়ালী বলে পরিচিত তারা সবাই ছিলেন বিহার প্রদেশের অধিবাসী হিন্দি ভাষাভাষী মানব গোষ্ঠীর লোক। সবাই তারা এই শহরে একই দাবি দাওয়ার ভিত্তিতে সংগ্রামে নেমেছিলেন। একই সাথে তারা তাদের পৃথক পৃথক ইউনিয়ন গড়ে তুলে রেজিস্ট্রেশনের জন্য আবেদনও করেছিলেন। কিন্তু দেশে তখনকার প্রচলিত ট্রেড ইউনিয়ন আইনে দিনমজুর ইউনিয়ন রেজিস্ট্রি হলেও শক্তিশালী সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির হস্তক্ষেপে রেল ও স্টিমার ঘাটের মালটানা মজুরদের স্থানীয় ইউনিয়নগুলোর আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়। তবু তাঁরা দিনমজুরদের সাথে এই আন্দোলনের সংশ্লিষ্ট থাকেন। রেল ও স্টিমার কোম্পানির মজুরেরা তাই দিনমজুরদের মতো নোটিশ দিয়ে ধর্মঘট করতে না পারলেও দিনমজুরদের ধর্মঘট আরম্ভ হয়ে গেলে রেল স্টেশন ও স্টিমার ঘাটের মাল চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। রেল স্টিমারে মালের বুকিং বন্ধ করে দিতে হয়। শেষ পর্যন্ত দিনমজুরদের ধর্মঘটের মীমাংসা হয়ে গেলে রেল ও স্টিমার কোম্পানিগুলোও এই মীমাংসার শর্ত মতো তাদের শ্রমিকদের মজুরি দিতে সম্মত হয়ে যায়।
নিজেদের মজুরি বৃদ্ধির সংগ্রামে সিলেট শহরের দিনমজুরা যে একতা ও নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছিলেন তাতে ধরে রেখেই তাঁরা তখনকার জাতীয় মুক্তি সংগ্রামেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। ঔপনিবেশিকতা বিরোধী এই মুক্তি সংগ্রাম দেশে তখন ক্রমবর্ধমান। ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হয়ে গেলে এই মুক্তি সংগ্রামকে ভারত রক্ষা আইনের প্রবল দমন পীড়নের মুখোমুখি গিয়ে পড়তে হয়। তখনকার সভা সমিতি ও মিছিলে যোগদানের অভিযোগে আন্দোলনের সারি থেকে অসংখ্য লোককে ধরে নিয়ে কারাগারে বন্দী করা হয়। চোখের মাননে এসব ঘটতে দেখেও সিলেট শহরের দিনমজুররা এ সংগ্রাম থেকে দূরে সরে থাকেন নি। ১৯৪০ সালের ২৬ জানুয়ারি কংগ্রেস ঘোষিত স্বাধীনতা দিবসে সিলেট শহরে সম্ভবত সর্বকালের বৃহত্তম মিছিলে তাঁরা নিজেদের দৈনন্দিন কাজ বন্ধ রেখে এসে মিছিলে যোগ দেয়। এ মিছিলে যোগ দেবার অভিযোগে বহু লোক পরবর্তিকালে অভিযুক্ত হন।
এ ধারার কাজে তাদের জীবন ও জীবিকার ওপর ঝুঁকি আছে জেনেও কোন দিন তাঁরা এ থেকে বিরত থাকেন নাই। বিশেষ বিশেষ দিনে তারা কাজ বন্ধ রেখে স্বাধীনতার দাবিতে অনুষ্ঠিত সভা ও মিছিলে গিয়ে যোগ দিতেন। দেশ বিভাগ পর্যন্ত কখনও তারা এ ধারা থেকে বিচ্যুত হন নাই।
দেশ বিভাগের পর এই সব অস্থানীয় মালটানা দিনমজুরেরা সিলেট শহর ছেড়ে তাদের জন্মভূমিতে ফিরে গেলে সিলেটের দিনমজুর ইউনিয়নের অস্তিত্ব লোপ পেয়ে যায়। জেলার গ্রামাঞ্চল থেকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্দশাগ্রস্ত ভূমিহীন চাষিরা তখন থেকে দলে দলে শহরে আসতে থাকে। পরবর্তিকালে শহরের মালামাল বহনের দায় দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে তারাই এখানকার মালটানা দিনমজুর বাহিনী গড়ে তোলেন। কিন্তু বিগত দিনের অস্থানীয় দেশোয়ালী মাল টানা দিন মজুরের মতো তাঁরা আর কোন দিন সংগঠিত হতে পারেন নি। সিলেট শহরে দিনমজুরির শর্ত ও পরিবেশ তখন থেকে মহাজনদের নিয়ন্ত্রণেই চলে যায়। আজও এই ব্যবস্থার কোন পরিবর্তন ঘটেনি।

সুত্রঃ অর্ধ শতাব্দী আগে গণআন্দোলন এদেশে কেমন ছিল’ গ্রন্থ থেকে।