১৫ আগস্ট থেকে ২১ আগস্ট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়

জুয়েল রাজ

১৫ আগস্ট, মানব ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়ের নাম। পৃথিবীতে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ইতিহাস নেই। ইতিহাসে বহু রাজনৈতিক নেতা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর মতো সপরিবারে আত্মীয় পরিজন সহ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা দ্বিতীয়টি নেই।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ সাধারণ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা, ধর্ষণ করেছে দুই লক্ষাধিক নারীকে। সেই পিশাচ পাকিস্তান ও বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সাহস করেনি সেই সময়। কিন্তু নিজের দেশে, নিজের ঘরে, নিজেরই সেনা সদস্যরা সেই জঘন্য কাজটা সম্পন্ন করেছে। তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে জেনেও বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা না করে বত্রিশ নম্বর রোডের ৬৭৭ নম্বর বাড়িতেই আটপৌরে বাঙালি মধ্যবিত্ত জীবনযাপন করতেন বঙ্গবন্ধু। সবার জন্যই বাড়ির দরজা ছিল খোলা।

১৯৬১ সাল থেকে এই বাড়িতে বসবাস শুরু করেছিলেন তিনি, এই ৩২ নম্বর থেকেই ৬২ সালের আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন, ৬৬ সালের ৬ দফা, ৬৯-এর গণ অভ্যুত্থান, ৭০-এর নির্বাচন, ৭১-এর মুক্তিসংগ্রামের রূপরেখা প্রণয়ন কিংবা বাঙালির মুক্তির বার্তা ৭ মার্চের সেই মহাকাব্য সবকিছুর সাথেই জড়িয়ে আছে ধানমন্ডির বত্রিশ। সেই ঐতিহাসিক বাড়িতেই ১৫ আগস্টের কালরাতে প্রাণ হারান জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট কোন সাধারণ বা রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড নয়। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড একটি আদর্শিক হত্যাকাণ্ড। বাঙালির প্রগতি চেতনা ও আদর্শিক অগ্রযাত্রাকে বিনাশের নীল নকশা। আর যার মূল স্তম্ভ ছিলেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্র করেই ছিল বাংলাদেশ। সদ্য স্বাধীন একটা দেশে সমস্যার পাহাড় ডিঙিয়ে, বঙ্গবন্ধু যখন শ্মশানে সবুজ ঘাস জন্ম দিচ্ছিলেন। ঠিক তখনই রক্তের প্লাবনে সব ডুবে যায়। বদলে দেয়া হয় ইতিহাসের গতিপথ, ব্যবচ্ছেদ করা হয় রক্তে অর্জিত সংবিধানের। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করে জেঁকে বসে পরাজিত পাকিস্তানি প্রেতাত্মাদের দোসরগণ। সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান ঘটে। একে একে পুনর্বাসিত হয় একাত্তরের রাজাকার আলবদর, আল শামস সহ যুদ্ধাপরাধীরা।

আজকের বাংলাদেশের উগ্র সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদ সবকিছু ৭৫-এর ১৫ আগস্টের পরবর্তী ফসল। যার চাষ করেছে বঙ্গবন্ধুকে হত্যাকারী খুনির দল। ইতিহাস বিকৃতি আর মিথ্যাচার করে বিভ্রান্ত করে দিয়েছে একটা প্রজন্মকে।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট শেখ হাসিনা তখন বিরোধীদলীয় নেত্রী। সিলেট, গোপালগঞ্জ সহ সারাদেশে বোমা হামলার প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দেয় আওয়ামী লীগ। একটি ট্রাকের উপর করা হয়েছিল মঞ্চ। ২০ মিনিট বক্তব্য শেষ করে যখন বিক্ষোভ মিছিলের ঘোষণা দেন ঠিক তখনই একের পর এক গ্রেনেড চার্জ শুরু হয়। অল্পের জন্য বেঁচে যান শেখ হাসিনা। নেতাকর্মীরা বুক পেতে দিয়েছিল সেদিন তাঁকে রক্ষা করতে। ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী ল্যান্স করপোরাল (অব) মাহাবুব রশিদ।

আইভি রহমান সহ ২৪ জন নেতাকর্মী সেদিন প্রাণ হারিয়েছিলেন। আহত, পঙ্গু হয়েছেন দলীয় প্রায় চার শত নেতাকর্মী। ১৯৮১ সালের ১৭ মে দীর্ঘ ৬ বছরের নির্বাসন শেষে বঙ্গবন্ধুবিহীন, পরিবার পরিজনবিহীন বাংলাদেশে ফিরে এসেছিলেন শেখ হাসিনা। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ি সেদিন ও ছিল অবরুদ্ধ। দেশে ফিরে আসার পর প্রতিনিয়ত তাঁকে তাড়া করেছে খুনির দল। গুনে গুনে ১৯ বার তাঁকে হত্যা চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু ভাগ্যক্রমে বারবার বেঁচে গেছেন তিনি। ২১ আগস্ট ছিল চূড়ান্ত আঘাত।

ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটু দেখলেই এর কারণগুলো পরিষ্কার হয়। ১৯৭১ সালের সদ্য ভূমিষ্ঠ বাংলাদেশ একটি দুর্ভিক্ষ, বন্যা, খরা পীড়িত, যুদ্ধ বিধ্বস্ত দরিদ্র একটি দেশ হিসাবেই বিশ্বের কাছে পরিচিতি পায়। যারা বাংলাদেশের জন্মের বিরোধিতা করেছিল, পাকিস্তানিদের পক্ষে ছিল, তারা চেয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে মিথ্যা প্রমাণ করতে। বঙ্গবন্ধুকে ব্যর্থ প্রমাণ করতে। পাকিস্তান পুনরুদ্ধার বাস্তবায়নকারী গোষ্ঠীর স্বপ্ন পূরণ করতে। বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বমহিমায় সবকিছু মিথ্যা প্রমাণ করে যখন ঘুরে দাঁড়াতে চেয়েছেন, বিশ্বপরাশক্তিদের তোয়াক্কা করেন নি। তখনই আঘাতটা আসে। কারণ তারা বুঝে গিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে যাবে, তাই তাঁকে নিঃশেষ করার অভিযানে নেমেছিল। যেমন করে মীরজাফরদের দিয়ে সিরাজকে হত্যা করে এক সময় ভারতবর্ষের অধিকর্তা হয়েছিল ব্রিটিশরা। ঠিক তেমনি খন্দকার মোশতাককে দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে, মোশতাক গংদের ইতিহাসের আস্তাকুড়ে ফেলে বাংলাদেশের দৃশ্যপটে উঠে আসে মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তির দোসররা। খুনিরা জানত জীবিত বঙ্গবন্ধুর চেয়ে ও মৃত বঙ্গবন্ধু আরও বেশি শক্তিশালী, তাইতো শুধু পরিবার নয় আত্মীয় পরিজন সহ হত্যা করা হয়েছিল।

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে সেই ভয় খুনিদের আতঙ্কিত করে তুলেছিল। ১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। বাতিল হয় ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ। শুরু হয় বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার প্রক্রিয়া। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার গড়তে কাজ শুরু করেন শেখ হাসিনা। আবার ও সেইসব পরাজিত শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেয়ার জন্য। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের রক্ষা করার জন্য। আর তাই একের পর এক হত্যাচেষ্টা।

মাত্র তিন বছরের শাসনামলে বঙ্গবন্ধু নিজেকে বিশ্বনেতাদের মাঝে দাঁড় করিয়েছিলেন। সেই একই কাজ করেছেন শেখ হাসিনা। বিশ্বের প্রভাবশালী নেতৃত্বে নিজের অবস্থা সুদৃঢ় করেছেন। বাংলাদেশকে নিয়ে গেছেন মধ্যম আয়ের দেশে, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচার এবং যুদ্ধাপরাধী ও মানবতা বিরোধী অপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা, অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে উন্নয়নের রোল মডেল হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন।

আর হত্যাকারী পাকিস্তানি দোসরদের জ্বালাটা ঠিক এখানেই। বঙ্গবন্ধুর রক্তের ধারা বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিলে মাথা তুলে দাঁড়াবে বাংলাদেশ। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পুনরাবৃত্তি ছাড়া আর কিছু নয়। পার্থক্য শুধু বঙ্গবন্ধুকে তারা হত্যা করতে পেরেছিল, শেখ হাসিনাকে পারেনি। কিন্তু তার হাল ছাড়বে না, একের পর এক সেই চেষ্টা করে যাবে।

গত ১৫ আগস্ট ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে আসা মিছিলে আত্মঘাতী হামলার পরিকল্পনা করেছিল সাইফুল ইসলাম নামের এক জঙ্গি। রাজধানীর পান্থপথে ওলিও হোটেলের একটি কক্ষে আত্মঘাতী বিস্ফোরণে মারা গেছে। কিন্তু ঘটনা এখানেই শেষ নয়। এই পরিকল্পনা ১৯৭৫ সাল থেকেই চলছে এবং চলবে। আগস্ট এলেই সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে উঠে পড়ে লাগে, ৭৫-এর ১৫ আগস্টের কুশীলব ও তাদের প্রতিপালকগণ। বারবার আক্রান্ত হয় বত্রিশ ধানমন্ডি, বারবার আক্রান্ত হয় বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবার।

দীর্ঘ ৪২ বছর পরেও বঙ্গবন্ধুদের হত্যাকারীদের সাজার রায় কার্যকর পরিপূর্ণভাবে করা সম্ভব হয়নি। ২১ আগস্টের আসামীরা ও বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের মতোই পলাতক। তাদের চক্রান্ত বন্ধ করা সম্ভব নয়। কখনো ঘোষণা দিয়ে, কখনো চক্রান্ত করে ১৫ আগস্টের মতো সব তছনছ করে দিতে বদ্ধ পরিকর।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ৫২ আসামীর মাঝে ১৯ জন এখনো পলাতক। এবং পত্রিকার ভাষ্যমতে, গোয়েন্দাদের ধারণা এদের অনেকেই পাকিস্তানে আশ্রয়ে আছেন। যেমন করে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আসামীরা পাকিস্তানে সাহায্য সহায়তা নিয়ে এখনো কেউ বিশ্বে বিভিন্ন দেশে, কেউ আবার পাকিস্তানেই বসবাস করছে। এই খুনি চক্র নিশ্চয়ই বসে বসে জাবর কাটবে না। তারা তাদের ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাস করে ও তারা বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে গেছে, এখনো চালাচ্ছে। একই অবস্থা ২১ আগস্ট হামলাকারীদের। কারণ ১৫ আগস্ট ও ২১ আগস্ট কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। শুধু স্থান কাল সময়টুকু ভিন্ন। তাই বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের দেশে ফিরিয়ে নিয়ে সাজা নিশ্চিত করার পাশাপাশি, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার আসামীদের ফিরিয়ে নিয়ে দ্রুত সাজা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

ডেভিড ফ্রষ্ট বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনার বড় শক্তি কি, বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন আমার দেশের মানুষকে আমি ভালোবাসি। আর আপনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কি? বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন আমি আমার দেশের মানুষকে ভালোবাসি । যারা বঙ্গবন্ধুকে কাছে থেকে দেখেছেন তাঁরা শেখ হাসিনার মাঝে বঙ্গবন্ধুর সেইসব মানবিক গুণাবলী খুঁজে পান।

প্রয়াত কূটনীতিক ও জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর স্ত্রী মেহেজাবীন চৌধুরী ১৫ আগস্টে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর শেখ হাসিনা যখন জানতে পারেন খন্দকার মোশতাক এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত, তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। বঙ্গবন্ধু নাকি বলেছিলেন কখনো বিপদে পড়লে তোমার মোশতাক কাকুর কাছে যেও!

মোশতাক কাকুরা এখনো আছে, হয়তো বা রূপ বদলেছে, কোথাও ভাই হয়েছে, কোথাও মামা হয়ে গেছে। কিন্তু চরিত্র বদলায় নি। শেখ হাসিনা বা তাঁর পরিবারের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে!

জুয়েল রাজ, ব্রিটেন প্রবাসী সাংবাদিক