যুগে যুগান্তরে বাংলার দরিদ্রতা

শমশের আলম

কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর বিখ্যাত “দারিদ্র্য” কবিতায় ব্যক্তিজীবনে দারিদ্রতার বিভৎস চিত্র তুলে ধরেছেন । দারিদ্র মানুষের জীবনে একটি বড় অভিশাপ। ইহা ব্যক্তিজীবন বিকাশের পথে যেমন বাঁধা হয়ে দাড়ায় তেমনি জাতীয় সমৃদ্ধির ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে । দারিদ্রের দৃশ্যমান প্রতিক হচ্ছে অপুষ্টি, ভগ্নস্বাস্থ, জীর্ণ বাসস্থান, বেকারত্ব , নিরক্ষরতা, ও সর্বোপরি বেকারত্বে নিপতিত রুগ্ন-দূর্বল মানুষ ও ক্ষুধা। বহু কবি সাহিত্যিকের লেখায় আমরা বিভিন্ন যুগের ক্ষূধা ও দারিদ্রতা সম্বন্ধে জানতে পারি।
দারিদ্রতা মানুষের স্থিতাবস্থা ভেঙ্গে দেয় । দূর্ভিক্ষের সময় কেমনভাবে চারপাশের অনাহারী মানুষের জীবন যাত্রায় ছেদ পড়ে তারই অপুর্ব আখ্যান ও ক্ষুধার প্রতিক্রিয়ার নিখুঁত চিত্রায়ন আমরা পাই মধ্যযুগের লেখক তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়ের “মন্বন্তর -১৯৪৪” গ্রন্থে ।
তাছাড়া ননীভৌমিকের “ধানকাটা” ; গোপাল হায়দারের –১৯৫০, দীনবন্ধু মিত্রের “নীল দর্পন”, সূবোধ বোসের “তিলাঞ্জলি” গজেন্দ্র কুমার মিত্রের ‘ম্যায় ভুখা হু’ গ্রন্থে অর্থাৎ গণজীবনের সাহিত্যে আমরা অন্নের জন্য করুণ প্রার্থনা দেখতে পাই।
১৯৪৫ সালে ‘দর্পণ’, ‘চিন্তামনি’, ও “কে বাচাঁয় কে বাঁচে” উপন্যাস রচনা করে ক্ষূধার এক জগৎ তৈরী করেন মানিক বন্দোপাধ্যায়। সলিল বন্দোপাধ্যায়ের “গরমভাত” কিম্বা “নিচক ভুতেরগল্প” এটিও বাংলার ক্ষুধা দারিদ্রের এক উল্লেখযোগ্য দলিল।
শরৎচন্দ্রের মহেষ গল্পে জমিদারের অত্যাচার আর শোষনের কষাঘাতে অসহায়তা ও দারিদ্র্যের
এমন নিখুঁত চিত্র তিনি তুলে ধরেছেন —–
সেখানে গফুরমিয়া বলছে “বিঘে চারেক জমি বর্গাচাষ করি ; কিন্তু উপরি উপরি দূ-সন আজন্মা। মাঠের ধান মাঠে শুকিয়ে গেল। বাপ-বেটিতে দূ’বেলা পেট ভরে খেতে পর্ষন্ত পাইনে “।
রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসে ক্ষুধার চিত্র খুব একটা দেখা না গেলেও আধুনিক বাংলা সাহিত্যের যুগে বঙ্কিমচন্দ্রের “দেবী চৌধুরানী” ও “আনন্দমঠ” উপন্যাসে মানুষের ক্ষিধে ও দারিদ্রতার ইঙ্গিত সুস্পষ্ট। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দেবী চৌধূরানী’ উপন্যাসে প্রফুল্লকে সেদিনকার ক্ষুধা নিবারণের জন্য পাশের বাড়ী চাল ধার করতে যেতে দেখা যায়। বঙ্কিম চন্দ্রের “আনন্দমঠ” উপন্যাসে ক্ষুধার যে বর্ননা আছে ; তা তৎকালীন বাংলা উপন্যাসে আর কোথাও দেখা যায়নি। ওখানেও ক্ষুধা আর অনাহার নিয়ে ব্যাপক বর্ণনা রয়েছে।
১৩৫০ এর মন্বন্তর ঘিরে ময়মনসিংহের ভাটিয়ালী
লোকগানে এমন মর্মস্পর্শী করুণ কাহিনীর কথা শোনা যায় —–
মনে কি কেউর পড়ে রে
মনে কি কেউর পড়ে
ক্ষূধার জ্বালায়
বুকের ছাওয়াল
মায়ে বিক্রি করে রে
চুরাই বাজারে।
চন্ডিমঙ্গল কাব্যে কালকেতু ও ফুল্লরার গল্পেও আমরা অনাহারের চিত্র খুঁজে পাই। চন্ডিমন্ডলে পার্বতী শিবকে বলছেন ——-
রন্ধন করিতে বলিলে গোঁসাই
প্রথমে যে পাত্র দিবে
ঘরে তাহা নাই ।
ইহাতে আরেকজন কবি লিখেছেন —-
স্ত্রীর বচনে ভাঁড়ু, ভাবে মনে মনে
আজকার অন্ন আমার
মিলিবে কেমনে !
ভাঙ্গা করি ছয় বুড়ি
গামছা বান্দিয়া
ছাওয়ালের মাথায় বোঝা
দিলেক তুলিয়া ।
চন্ডিমঙ্গল কাব্যে বিখ্যাত কবি মুকুন্দরাম
লেখেন ——
তৈল বিনা কৈলু স্নান
করিলু উদক পান
শিশুকাঁদে ওদনের তরে।
আবার অন্য জায়গায় কালকেতু ফুল্লরার দুঃখ দূর্দশা তুলে ধরে কবি মুকুন্দরাম বলেন ——-
মাংশের পসরা লইয়া
ফিরি দ্বারে দ্বারে
কিছু খু্ঁদ কুঁড়া পাই
উদর না ভরে ।
দশম শতাব্দী হতে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত চর্যার বচনাকাল। আদিযুগের সাহিত্য হল চর্যাপদ। চর্যাপদের কবি ভুসুকপা । তাঁর রচনায়ও সেখানে দেখা যায় — ডোম, চন্ডাল ও নিষাদের জীবনের যন্ত্রনা, অভাব আর অন্নহীনতাই প্রকট আকার ধারণ করেছিল । যেমন —
ঢালত মোর ঘর
নাহি পরবেশী
হাঁড়িত ভাত নাই
নিতি আবশী ।
ঋকবেদের গল্পে আছে, বামদেব ঋষি বলছেন —–
“আমি কুকুরের নাড়ীভুড়ি রান্না করে খেয়েছি”।
এখানে বামদেবের যে ক্ষুধার তাড়না তাতে চন্ডালের আহার করা কুকুরের মাংশও তিনি জোগাড় করতে পারছেন না। তাই বাধ্য হয়ে চন্ডালও যা ফেলে দেয়, সেই কুকুরের নাড়ীভূড়ি তিনি রেঁধে খাচ্ছেন। এটি প্রাচিনতম যুগেরই একটি সমাজচিত্র ।
তাইতো রামচন্দ্র তাঁর ভাববাদের জগৎ থেকে বাস্তব জগতে এসে বলতে বাধ্য হন — “অন্নচিন্তা ভয়ঙ্কর” । হাঁ ভাই — পেটে ভাত না থাকলে কালিদাসও বুদ্ধিহারা হবেন।
স্বাদে কী কবি সুকান্ত বলেছিলেন —– “ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পুর্ণীমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।”

লেখক :: শমশের আলম, সমাজ গবেষক