ঈদের ছুটিতে ঘুরে আসুন বড়লেখার মনোমুগ্ধকর স্থানগুলো

এ.জে লাভলু, বড়লেখা প্রতিনিধি::

মৌলভীবাজার জেলার উত্তর প্রান্তিক জনপদ বড়লেখা উপজেলা। প্রাকৃতি এ উপজেলাকে যেনো তার সবটুকু রূপ ঢেলে সাজিয়েছে। তাইতো এখানকার প্রকৃতি যেকোন মানুষকে সহজেই কাছে টানে। এজন্য প্রকৃতিপ্রেমীরাও অবসর পেলেই ছুটে আসেন এখানে। যান্ত্রিক জীবনে প্রকৃতির পরশ মাখতে চাইলে আপনিও এবারের ঈদুল আযহার ছুটিতে পরিবারের সদস্য নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন বড়লেখা থেকে। পর্যটকদের মুগ্ধ করার জন্য এখানে রয়েছে বেশ কয়েকটি দর্শনীয় স্থান। এরমধ্যে প্রধান আকর্ষণ দেশের সর্ববৃহৎ জলপ্রপাত মাধবকু- ও ইকোপার্ক। এ ছাড়াও প্রাকৃতিক ঝর্ণা ঝেরঝেরি-ফুলবাগিচা, এশিয়ার সর্ব বৃহত্তম হাওর হাকালুকি, পাহাড়-সমতলে সারি সারি চা বাগান, আদিবাসি খাসিয়াদের পল্ল¬ী ও মনোহর আলী মাস্টারের চোখ জোড়ানো পাখিবাড়ি ভ্রমণ পিপাসুদের হাতছানি দিচ্ছে।

মাধবকু- জলপ্রপাত :
মাধবকু- জলপ্রপাতে যাওয়ার উত্তম সময় হলো বর্ষাকাল। এই সময় ঝর্ণা পানিতে পূর্ণ থাকে। পাহাড়ি ছড়ার প্রায় ২শ’ ফুট উপর থেকে যুগ যুগ ধরে গড়িয়ে পড়ছে পানি। এই স্বর্গীয় আমেজের খুঁজেই এবারের ঈদের ছুটিতে ঘুরে আসতে পারেন মাধবকু- জলপ্রপাতে। কয়েক যুগ ধরে মাধবকুন্ড জলপ্রপাতের অঝরধারা প্রবাহমান থাকলেও সত্তরের দশকে দর্শনীয় স্থান হিসেবে এটির পরিচিতি প্রকাশ পায়। বড়লেখা উপজেলার ৮নং দক্ষিণভাগ উত্তর (কাঁঠালতলী) ইউনিয়নের গৌরনগর মৌজায় মাধবকু- জলপ্রপাতের অবস্থান। প্রায় ২০০ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট মাধবকন্ড জলপ্রপাত, সুবিশাল পর্বত গিরি, শ্যামল সবুজ বনরাজি বেষ্টিত ইকোপার্ক, পাহাড়ী ঝরনার প্রবাহিত জলরাশির কলকল শব্দ সবমিলিয়ে মাধবকু- বেড়াতে গেলে পাওয়া যায় এক স্বর্গীয় আমেজ। জলপ্রপাতের পাশ ঘেষে যাওয়া খালটির উপর নির্মাণ করা হয়েছে কৃত্রিম পাখি, মৎস্যকন্যা, মাছ প্রভৃতির দৃষ্টিনন্দন সব মূর্তি।

ঝেরঝেরি-ফুলবাগিচা :
পাথারিয়া পাহাড়ের নির্জন পল্লী ডিমাই পুঞ্জির পাশ দিয়ে দুর্গম পাহাড়ি ছড়ার পথে হেঁটে গেলে চোখে পড়বে কয়েকটি ছোট ঝর্ণা। ছোট হলেও চোখ কাড়ে। ঘন্টা দেড়েক (প্রায় ৬ কিলোমটিার) পিচ্ছিল পাথুরে ছড়া দিয়ে হাঁটার পর ওপরে ওঠলে দুটি টিলার ভিতরে দেখা যাবে ঝেরঝেরি ঝর্ণা। দুর্গম পথ পারি দেওয়ার ক্লান্তি ঝেরঝেরির শীতল জলধারায় অনেকটাই কমে যাবে। একটু অদূরে ঝেরঝেরির ঠিক ডান পাশে রয়েছে ইটাউরি ফুলবাগিচা ঝর্ণা। ছড়ার পথ ধরে ফুলবাগিচায় যাওয়া যাবে না। টিলার ভেতর দিয়ে রাস্তাটি খুবই সরু। ফুলবাগিচায় যেতে হলে প্রায় ৬০-৭০ ফুট উঁচু খাড়া দুটি পাহাড়ের পিচ্ছিল পথ বেয়ে এগিয়ে গেলে তখনই চোখে পড়বে ফুলবাগিচা জলপ্রপাত। বর্ষাকালে এই ঝর্ণাগুলো যৌবনদীপ্ত থাকে। শুষ্ক মৌসুমে এগুলোর কয়েকটি শুকিয়ে যায়। এছাড়াও পাথারিয়া পাহাড়ের ফুলছড়ি নামক স্থানে রয়েছে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট নান্দনিক একটি মাটির ব্রিজ যা স্থানীয়দের ভাষায় মাটির পুল নামে পরিচিত।

হাকালুকি হাওর :
বর্ষা আর হেমন্ত এ দুই মৌসুমে প্রকৃতির বুকে দুই ধরণের চিত্র ধারণ করে হাকালুকি হাওর। ভরা যৌবনে হাকালুকির স্বচ্ছ জলরাশির শান্তভাব যেনো প্রকৃতির বুকে শীতলপাটি বিছিয়ে দেয়। এ দৃশ্য দেখে বিমোহিত হন পর্যটকরা। স্বচ্ছ জলে সাঁতার কাটেন অনেকে। হাকালুকির এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে বড়লেখার অংশে অবস্থান করতে হয়। সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিনিয়ত দেশ-বিদেশ থেকে এখানে ছুঁটে আসেন পর্যটকরা। ২-৩’শ টাকায় স্থানীয়রা ছোট ট্রলারে করে পর্যটকদের ঘুরিয়ে দেখান হাকালুকির তীরবর্তী এলাকা। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় হাওরের জলরাশির মধ্যে সূর্যের প্রতিচ্ছবি মুগ্ধ করে পর্যটকদের। এছাড়া হাওরের সৌন্দর্যের পাশাপাশি ভ্রমণ পিয়াসুদের জন্য নির্মিত ওয়াচ টাওয়ার এবং বন্যপ্রাণী বিভাগের অফিস নজর কাড়বে যে কারও।

পাখি বাড়ি :
শীত, বর্ষা কিংবা গ্রীষ্ম। বছর জুড়ে পাখির কলকাকলিতে মুখরিত থাকে বাড়িটি। তবে শীত মৌসুমে পাখির সমাগম বৃদ্ধি পায়। প্রায় দুই একর আয়তনের বাড়ির চারদিকে রয়েছে নানা জাতের গাছ। বাড়ির এসব গাছে বসবাস করছে দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির পাখি। পাখিদের কলতান, ওড়াউড়ি আর এখানকার প্রাকৃতি দেখতে প্রতিদিন অনেক দূর-দূরান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ ভিড় করেন পাখি বাড়িতে। বিশেষ করে ছুটির দিনে মানুষের ভিড় একটু বেশি থাকে। চোঁখজোড়ানো এ পাখি বাড়ির অবস্থান বড়লেখা উপজেলার হাকালুকি হাওরের হাল্লা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের লাগোয়া। বাড়িটি এক সময় মনোহর আলী মাস্টারের বাড়ি নামে পরিচিত ছিল। বিগত প্রায় ৪০ বছর ধরে দেশি-বিদেশি পাখির দখলে যাওয়ায় বাড়ির প্রকৃত মালিকের নাম চাপা পড়ে এখন বাড়িটি পাখিবাড়ি নামেই পরিচিত।

সারি সারি চা বাগান :
বড়লেখায় টিলার পাদদেশ আর সমতলের সারি সারি চা বাগানের সৌন্দর্য সরসরি না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। চায়ের একেকটি টিলায় যেন প্রকৃতি সবুজ গালিচা বিছিয়ে রেখেছে। উপজেলার ১৪ চা বাগানের সবুজের সমারোহ চা কন্যাদের পাতি চয়নের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য প্রকৃতি প্রেমীদের মন ভরিয়ে দেবে।