মিয়ানমার বলছে রোহিঙ্গারা বাঙ্গালী সন্ত্রাসী

শমশের আলম

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল মুহিত যথার্থই বলেছেন, এটা বাংলাদেশের প্রতি বার্মার পরোক্ষ আক্রমন। আমি মনেকরি কেবল বার্মা নয় একটা উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়া একটি দেশের উন্নয়নকর্মকান্ডে অন্তরায় সৃষ্টির আন্তর্জাতিক পরোক্ষ ইন্দন বলা যায়। কারন এখানে প্রশ্ন জাগে, মায়ানমারের রোহিঙ্গার প্রতি যে নিষ্ঠুর আচরণ তা আজ বিশ্ব বিবেক আমেরিকা, ইইউ, জাতিসংঘ, চীন, ভারত জাপান এমন কি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাসহ সবাই যেন নিরব দাড়িয়ে মানুষের হত্যাযজ্ঞের দৃশ্য বাংলাদেশ ও তার অভ্যন্তরে রোহিঙ্গাদের প্রতি বাঙ্গালীর কেমন আচরন তা অবলোকন করছে।
সূচির অমানবিক আচরন, রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলমানদের নির্বিচারে হত্যা ও নির্যাতনের প্রতিক্রিয়ায় চার লাখেরও বেশী লোক সুচির নোবেল পুরষ্কার ফিরিয়ে নেয়ার দাবী করে । নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি বলেছে, তারা এ পূরষ্কার প্রত্যাহার করবে না। তারা বলেছে মায়ানমার বাহিনীর অবরোধের মুখে ২৪ আগষ্ঠ শেষ রাত্রিতে রোহিঙ্গা যোদ্ধারা ২৫ টি পুলিশ স্টেশনে হামলা ও সেনাক্যাম্পে প্রবেশের চেষ্টা চালায় কিন্তু কেন এ অবরোধ তার বিষয়ে কোন কথা নরওয়ে বলে নাই। তাহলে তারা কি জানে না গত বছর নভেম্বর মাসে জাতিসংঘের শরনার্থী সংস্থা বিযয়ক একজন উর্ধতন কর্মকর্তা (ইউএনএইচসি আর)অভিযোগ করেছেন, ‘মিয়ানমারের সরকার সে দেশের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন অভিযান চালাচ্ছে’। তখন কক্সবাজারে তাদের প্রধান কর্মকর্তা জন ম্যাককিসিক বলেছেন, “মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা পুরুষদের হত্যা করছে, শিশুদের জবাই করছে, নারীদের ধর্ষন করছে, বাড়ীঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে ও লুটতরাজ চালাচ্ছে, একথা গুলো কি তাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করে নাই । না করবে না, কারন একটাই ! এরা মুসলমান জাতিগোষ্ঠি।
চীন আজ কোন কথা বলছে না বরং চীনের অকৃত্রিম সমর্থনই আজ মায়ানমার সরকারের সবচেয়ে শক্তির উৎস । চীনের সমর্থনের কারন তাদের ব্যবসা ও বানিজ্য । তারা দীর্ঘদিন থেকে ময়ানমারের স্থল ও সমুদ্র থেকে গ্যাস উত্তোলন করে নিয়ে যাচ্ছে । মায়ানমার ইসুতে চীন ভারত আমেরিকা তাদের বন্ধু । ভারতের বিভিন্ন কোম্পানী মায়ানমারে ব্যবসা করছে ও ব্যবসার পরিকল্পনা আছে। তাদের একটা বৃহৎ গ্যাস কোম্পানী বাংলাদেশের কাছাকাছি মায়ানমান ব্লকে গ্যাস অনুসন্ধান করছে। তারা সেখানে প্রচুর গ্যাসের সন্ধান পেয়েছে এবং তা তারা ভারতে নিয়ে যেতেও চায় ।
গত ক’দিন আগে মোদীর মায়ানমার সফরকে বিশ্ববাসী ইতিবাচক দৃষ্টিতে ভেবেছিল ; কিন্তু না সে আশায়ও গুড়েবালি। তিনি বরং সন্ত্রাসী দমনে সহযোগীতার আশ্বাস প্রদান করেই তাকে তার মানবিক দায়ীত্ব থেকে সরে দাড়াতে দেখা যায়। আমরা ভেবেছিলাম হয়তো তিনি বলবেন সন্ত্রাসী কার্যক্রম অর্থাৎ রোহিঙ্গা জনগোষ্টি তাদের অধিকারের আন্দোলন করতে গিয়ে যদি সন্ত্রাসী কার্যক্রম করেও থাকে তাহলে এটা তাদের নিজস্ব আভ্যন্তরীন ব্যাপার । কিন্ত তাইবলে কি তারা রোহিঙ্গাদের হাজার হাজার বাড়ীঘর এবং একের পর এক রোহিঙ্গা গ্রাম জালিয়ে দিবে। তাদের হত্যাযজ্ঞ থেকে রেহাই পাবে না বয়োবৃদ্ধ নারী এবং শিশুরাও । তাদের এই সহিংসতায় প্রাণ হারায় তিন হাজার নিরপরাধ রোহিঙ্গা। জাতিগত বিবেদ সৃষ্টি করে কেন তারা বাংলাদেশের মত একটি প্রতিবেশী দেশে রোহিঙ্গাদের সুকৌশলে পুশবেক করছে ।
এনিয়ে বারবার মানবিক কারনে বিপর্যয়ের সম্মুখিন হতে হচ্ছে বাংলাদেশকে । আমরা ভেবেছিলাম তিনি এসব বিষয়ে একটা সুরাহায় পৌছবেন, কথা বলবেন বিষয়টিকে একটা আন্তর্জাতিক সমাধানের প্রেক্ষাপট তৈরী করবেন। কিন্তু বাস্তবে আমরা কি দেখলাম ?
এবার দেখাযাক, এশিয়াভিত্তিক জাপান কি করছে। জাপানও কোন কথা বলছে না কারণ সেখানে তাদেরও বানিজ্য কারণ তারা তিন বছর আগ থেকে জাপানের বড়বড় ২৪টি কোম্পানী মায়ানমারে বিশাল বিশাল শিল্প-পার্কের কাজ করছে । ১৩০০ মেঘাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ অসংখ্য বানিজ্য খাত নিয়ে তারা ব্যস্ত। এসব রোহীঙ্গা নিধন নিয়ে তাদের ভাবার সময়টুকু কোথায় ? তাছাড়া মায়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে রোহিঙাদের যুদ্ধ শুরুহলে মায়ানমার সেনাবাহিনীর সাথে যোগদেয় বৌদ্ধ চরমপন্হিরা এ যেন মুসলমানের সাথে জাতিগত সংঘাত।
রোহিঙ্গা নিয়ে কাজ করা “দি আরাকান প্রজেক্ট ” নামক একটি সংস্থার ডিরেক্টর ক্রিস লিউয়া এবিসি নিউজকে বলেন– ” একান্ত বিশ্বাসযোগ্য প্রতিবেদন থেকে আমি জেনেছি নারী ও শিশুকে সেনাবাহিনী হত্যা করছে “।
বেসামরিক লোককে দেদারছে একটি দেশের সেনাবাহিনী হত্যা করবে আর অংসান সূচি বিবিসিকে বলবেন–“এথনিক ক্লিনজিং বা জাতিগত নির্মুল শব্দটা রাখাইনের চলমান পরিস্থিতির উপর মোটেই মানানসই নয়”। তাই যদি হয় তাহলে রোহিঙ্গারা প্রান বাচাতে বাংলাদেশে আসছে কেন ?
দি গার্ডিয়ানের দেয়া হিসাব মতে এপর্যন্ত ১৭ টি পুড়িয়ে দেয়া গ্রাম চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে এবং গণহত্যা থেকে বাচঁতে এ সপ্তাহে দেড় লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে। সব মিলিয়ে রোহিঙ্গা সরনার্থী এখন দেশে সাতলক্ষেরও অধিক। একান্ত মানবিক কারনে বাংলাদেশ রোহিঙ্গদের প্রবেশের সুযোগ দিচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক সংস্হাগুলোও তাদেরকে আসার সুযোগ দেয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। বাংলাদেশের নীতি রোহিংগাদের ঢুকতে দেয়া যাবে না ; কিন্তু বাস্তবে ঢুকছে । এদিকে দূর্যোগ ও ত্রানমন্ত্রী জানিয়েছেন, মায়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের খাওয়া ও চিকিৎসা সেবার জন্য বাংলাদেশ সরকারের কোন কৃপনতা নেই। যদিও তাদের সাময়িক আশ্রয় দেয়া হয়েছে ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে কিন্তু বাস্তবে এই বিপুলজনগোষ্টির দায়ভার ও চিকিৎসা সেবা দেয়া ৫৫ হাজার বর্গমাইলের ১৬ কোটি জনঅধ্যুষিত দেশের পক্ষে যোগান দেয়া কী বার্মার পরোক্ষ আক্রমন নহে ? তাই এখন আমাদেরকে গভীরভাবে ভেবে দেখার সময় এসেছে ।

 

লেখক :: শমশের আলম, সমাজ গবেষক