রোহিঙ্গা নিপীড়নের অন্তরালে

সৈয়দ রশিদ আলম

মাসখানেক ধরে মিয়ানমারের তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকার ও সামরিক বাহিনী রাখাইন প্রদেশের মংডু নগরীতে হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠেছে। সারা পৃথিবীর সব প্রচারমাধ্যমে বিষয়টি এলেও মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকার এই গণহত্যাকে অস্বীকার করে যাচ্ছে। অস্বীকার করার মূল কারণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি প্রতিবাদ হচ্ছে না। মুসলিম বিশে^র অন্যতম প্রধান দেশ সৌদি আরব এখন পর্যন্ত নীরবতা পালন করে যাচ্ছে। যেটা তাদের স্বাভাবিক স্বভাব। যেহেতু সৌদি আরব প্রায় দুই বছর থেকে ইয়েমেনে বিমান হামলা চালিয়ে হাজার হাজার মানুষ হত্যা করেছে, সে কারণে মুসলিম বিশে^ সংকটময় মুহূর্তে সৌদি আরব নীরবতা পালন করে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এক সময় এই রাখাইন প্রদেশটি আকিয়াব প্রদেশ নামে পরিচিত ছিল। সেখানে এই রোহিঙ্গারাই দেশটি চালাত। ৪০ দশক থেকে মিয়ানমারের শাসকরা আকিয়াব প্রদেশটি দখল করে নেয়। তার পর থেকে নামকরণ করা হয় রাখাইন প্রদেশ। উপজাতি রাখাইন সম্প্রদায়ের নামে এই নামকরণ করা হয়েছে। বার্মার যখন সামরিক শাসক নেউইন ক্ষমতায় ছিলেন তখন থেকেই রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর অত্যাচার শুরু হয়। সেনাবাহিনী থেকে রোহিঙ্গাদের বহিষ্কার করা হয়। তাদের নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। তখন থেকে রোহিঙ্গা নাগরিকদের রাজধানী রেঙ্গুন, যা বর্তমানে ইয়াঙ্গুন নামে পরিচিত সেখানে তাদের প্রবেশ বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিশ^ বিবেকের নীরবতাকে কাজে লাগিয়ে মিয়ানমারের সামরিক সরকার ও তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা নাগরিকদের নিজেদের দেশের নাগরিক বলে মেনে নিতে পারছে না। তাদের বক্তব্য, এরা বাঙালি, বাংলাদেশের নাগরিক। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এই রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ৬০০ বছর থেকে বসবাস করছে। একসময় তাদের আকিয়াব প্রদেশটি নিজেদের দেশ ছিল। সেটি মিয়ানমার সরকার দখল করে নেওয়ার পর থেকে তারা তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে অবহেলিত, ধর্ষিত, অত্যাচারিত হচ্ছে কিন্তু তারপরও তাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সরকার মিথ্যাচার করে যাচ্ছে।

এমন অবস্থা হয়েছে যে, রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সরকারের অত্যাচার যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। গত কয়েক দিন থেকে বিশ^বাসী বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে দেখেছে রোহিঙ্গা মুসলমানদের টুকরো টুকরো করা হচ্ছে, তাদের হাত-পা, গলা কেটে রাখাইন উপজাতি, মিয়ানমার পুলিশ, সেনা সদস্য ও উগ্র বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা উল্লাস করছে। যদি বিশ^ বিবেক প্রথম থেকে রোহিঙ্গাদের পক্ষে অবস্থান নিত তাহলে মিয়ানমারের সামরিক কর্মকর্তা ও তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার করার সাহস পেত না।

এছাড়া একাধিক দেশ যেমন ভারত, পাকিস্তান, চীন ও ইসরাইল মিয়ানমারকে সামরিক প্রশিক্ষণ ও সমরাস্ত্র দিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি মিয়ানমার বিমান বাহিনীতে পাকিস্তানের তৈরি ৬টি জেএফ-১৭ জঙ্গি বিমান যোগ দিয়েছে। আরও ৬টি জঙ্গি বিমান চলতি বছরের মধ্যে মিয়ানমার লাভ করবে। এছাড়া ভারত থেকে সামমেরিন বিধ্বংসী টর্পেডো মিয়ানমার ক্রয় করবে। মিয়ানমার সেনা সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে ইসরাইলের কমান্ডোরা। এর ফলে বাংলাদেশের সীমান্ত পর্যন্ত ইসরাইলের দৃষ্টি থাকবে। এছাড়া চীন ও রাশিয়া দীর্ঘদিন থেকে মিয়ানমারের কাছে সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করছে।

এখন স্বাভাবিকভাবে সবাই জানতে চায় কেন মিয়ানমার সরকার রাখাইন প্রদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের উৎখাত করতে চাচ্ছে। এই রাখাইন প্রদেশে রয়েছে তেল ও গ্যাসের খনি। চীন সরকার এখানে ২০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে। যদি রোহিঙ্গা মুক্ত করা যায় তাহলে রাখাইন প্রদেশে চীনের সামরিক উপস্থিতি বেড়ে যাবে। উদ্দেশ্য ভারতের দিকে নজরদারি রাখা। বাংলাদেশ সরকারের করণীয় হবে আন্তর্জাতিক সব ফোরামে সমস্যাটা তুলে ধরা। মিয়ানমার সরকার চাচ্ছে বাংলাদেশ যেন মিয়ানমারের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। তাহলে রাখাইন প্রদেশ থেকে রোহিঙ্গা মুসলমানদের তারা উৎখাত করতে পারবে। বাংলাদেশের একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী প্রয়োজন তা না হলে আগামীতে আমাদের অপ্রস্তুত থাকার সুযোগ নিয়ে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশের দুঃসাহস দেখাতে পারে।

বাংলাদেশে যেসব রোহিঙ্গা মানবিক আশ্রয় পেয়েছে তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর তাদের ওপর নতুন করে অত্যাচার হবে না, এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। যে কারণে আমরা বিশ^ বিবেকের নীরবতা ভঙ্গ করার অনুরোধ করছি। ইতিমধ্যে খ্রিষ্টান ধর্মের প্রধান পোপ ফ্রান্সিস রোহিঙ্গা মুসলমানদের পক্ষে বিবৃতি দিয়েছেন।

কিন্তু সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, আরব আমিরাত, বাহরাইন ও পাকিস্তানের মতো মুসলিম দেশগুলো নীরবতা পালন করছে। কারণটা কি? কারণ একটাই তারা বকধার্মিক। স্বার্থবাদী। আমরা অসহায় রোহিঙ্গা সম্প্রদায়সহ বিশে^র সব নির্যাতিত মানুষের প্রতি আমাদের সহানুভূতি ব্যক্ত করছি।

সৈয়দ রশিদ আলম: নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনীতি পর্যবেক্ষক