অংসান সূচী ও মায়ানমার সেনাপ্রধানকে আমার খোলা চিটি

শমশের আলম

তোমাদের ভাষা আমি জানি না, তাই ভাষান্তর করে নিও। রোহিংঙ্গা নিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না, তোমরা যা করছো তা বিশ্ববাসী প্রতিমূহুর্তে দেখছে আর ধিক্কার দিচ্ছে ।
মনে রেখ, এই স্রষ্টার রাজ্যে শাসকেরা যুগে যুগে নিজ-নিজ অধিকার আদায়ের প্রতিবাদী কন্ঠগুলোর মুখ স্তব্ধকরে দেয়ার জন্য বারবার Genocide. তথা গণহারে গণহত্যা চালিয়ে গেছেন কিন্তু পরিণতিতে সেই শাসকরাই ইতিহাসে কুখ্যাত হয়ে অপমানজনকভাবে শেষ পরিণতি ভোগ করে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। শুধু বিদায় নেন নাই , তাদের আজো বিশ্ববাসী ঘৃণাভরে স্মরণ করছে ও যুগেযুগে তা করবেও । এই ঘৃণিত শাসকরা নিরঙ্কুশ ক্ষমতাশালী হওয়া সত্ত্বেও যেমনি পারেননি নিজ ক্ষমতা ধরে রাখতে, তেমনি পারেননি নিজ মৃত্যুকেও ঠেকিয়ে রাখতে। কারণ নির্দিষ্ট সীমার অতিরিক্ত যে বেঁচে থাকা যায় না এবং ক্ষমতাকে যে ধরেও রাখা যায় না সেই বাস্তব জ্ঞানটুকু তারা ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে হারিয়ে ফেলেছিলেন। আর এটাও তারা ভুলে গিয়েছিলেন যে রাষ্ট্রক্ষমতা কারো নিজস্ব সম্পদ নয়। রাষ্ট্রের মালিক জনগন। আর জেনে রাখা দরকার এই জুলুমবাজ শাসকদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে করুণ পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে। তবে কাউকে এককভাবে আবার কাউকে পরিবাবর্গ নিয়ে। আবার অনেকের দেশের মাটিতে মৃত্যুবরণ করার সৌভাগ্যটুকু হয়নি। ক্ষমতার দম্ভের দাম্ভিকত্বে হারিয়ে যাওয়া সেই ক্ষমতাবাজদের মধ্যে কয়েকজনের স্মৃতি রোমন্থন করার জন্যই তোমাদেরকে আজকের আমার এ লেখার আয়োজন ।
আশা করি বিজ্ঞানের এই বিশ্বায়নে মিডিয়ার কল্যাণে আমার এই কথাগুলো তোমাদের দৃষ্টিগোচরে দৃষ্টিভুত হইবে এবং ক্ষমতান্ধদের নির্মম ও করুণ পরিণতির ইতিহাস মর্মে মর্মে উপলব্ধি করার বিন্দূমাত্রও প্রয়াস হয়তো ঘটিবে । শোন — তোমাদের চেয়ে আরও অধিক শ্রেনীর নিষ্ঠুর শক্তিশালী কতিপয় ইতিহাসের নিষ্ঠুর পাষাণ-ব্যক্তি ও ক্ষমতালোভীদের ইতিহাস একটু জেনে নিও । এবং জেনে নিও তাদের শোচনীয় পরিনতির করুণ ইতিহাস

প্রথমেই —
রাশিয়ার সর্বশেষ জার শাসক নিকোলাসের কথা বলছি । তিনি মাত্র ২৬ বছর বয়সে ১৮৯৪ সালে ক্ষমতায় এসে ২৩ বছরের শাসনে বিশাল কুকর্মের অনেক কীর্তি বিশ্ববাসীকে উপহার দিয়ে গেছেন। সবার কাছে তার পরিচিতিটা ছিল খুনী, রক্তপিপাসু, একগুঁয়ে ও সংঘাতপ্রিয় এক অমানুষ হিসেবে। তার রাজত্বকালে অরাজকতারই বেশী জয়জয়কার ছিল। নারী-শিশু, পুরুষ নির্বিশেষে গণহত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন ছিল তার নিত্য দিনের ঘটনা।
তারই নির্দেশে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ৩৫ লাখ বলশেভিক রুশ নাগরিককে হত্যা করা হয়। কিন্তু এই একনায়কত্ব একসময় তাকে চরম পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে বাধ্য করে। ১৯১৭ সালে ক্ষমতাচ্যুতির পর বন্দি করা হয় নিকোলাসকে। সাথে ছিলেন তার স্ত্রী অ্যালেজান্দ্রা, একমাত্র পুত্র অ্যালেক্সি চার কন্যা ওলগা, তাতিয়ানা, মারিয়া আর আনাস্তাসিয়া। তাদের পারিবারিক ডাক্তার ইউজিন বটকিন, পরিবারের পাচক ইভান খারিতোনভ এবং এলেক্সি ট্রুপ। তৎকালীন শাসক লেলিনের নির্দেশে পরিবারসহ নিকোলাসকে হত্যা করা হয়। লেলিন বাহিনী এরপর এদের বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। পরবর্তীতে প্রশ্ন উঠেছিল কি অপরাধ করেছিল জারের চার কন্যা আর একমাত্র ছেলে, জারের স্ত্রী, জারের ডাক্তার, পাঁচকরা ? একজনের পাপ পুরো পরিবারকে কেন বহন করতে হবে ? নিকোলাসের ছোট ভাই মাইকেলও বলশেভিকদের হাতে নিহত হন। এই নিষ্টুর হত্যাযজ্ঞ ও মানুষের আত্মার অভিশাপ থেকে নিকোলাস মুক্তি পাননি। এটা ঈশ্বরের যথাপোযুক্ত একজন নিষ্ঠুর রক্তপিপাসু পাপীর প্রতি যথার্থ প্রতিশোধ নয় কী ?

দ্বিতীয়ত —
ইতিহাসে আরেক কুখ্যাত এবং সবচেয়ে আলোচিত একনায়কের নাম এডলফ হিটলার। অস্ট্রীয় বংশোদ্ভূত জার্মান রাজনীতিবিদ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যিনি সবচেয়ে বড় নিষ্টুর খলনায়ক ছিলেন। ক্ষমতার প্রতি আকর্ষণটা সব সময়ই হিটলারের ছিল। মোহনীয় বক্তৃতার মাধ্যমে জাতীয়তাবাদ, ইহুদি বিদ্বেষ ও সমাজতন্ত্র বিরোধিতা ছড়াতে গিয়ে এক সময় জনপ্রিয় নেতায় পরিণত হন হিটলার। জেল খাটার ঠিক ১০ বছর পর ভোটে জিতে জার্মানির ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। নাৎসীবাদের প্রবক্তা ১৯৩৪ সালে সমগ্র জার্মানির প্রভু হিসেবে ঘোষণা করেন নিজেকে। নাৎসীরা তাদের বিরোধী পক্ষের অনেককেই হত্যা করেছিল। সামরিক বাহিনীকে নতুন নতুন সব অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করেছিল। সর্বোপরি একটি আক্রমণাত্মক ও ফ্যাসিবাদী একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। নাৎসীবাদের মাধ্যমে হিটলার মূলত তার উগ্র চিন্তার বাস্তবায়ন করেছিলেন। গ্যাস চেম্বারে ৬০ লাখ ইহুদিকে হত্যা, ধর্ষণ, অমানুষিক নির্যাতনসহ জার্মান সেনাদের দিয়ে জঘন্য কাজ করাতে বাকি রাখেননি হিটলার। ১৯৪৫ সালে বার্লিন যুদ্ধে নিশ্চিত পরাজয় জেনে স্ত্রী ইউ ব্রাউনকে নিয়ে বাঙ্কারে আত্মহত্যা করেন এই দুনিয়া দাপিয়ে বেড়ানো স্বৈরাশাসক। তা থেকে তোমাদের শিক্ষা নেয়া উচিত।

তৃতীয়ত —-
মুসোলিনি ১৯২২ সাল থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত ২১ বছর ইতালির একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিপতি ছিলেন। তাকে বলা হয় ফ্যাসিবাদের জনক। তিনি ছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ইতালির সর্বাধিনায়ক। মুসোলিনির জন্ম ইতালির ফোরলি শহরের একটি কামার পরিবারে। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে উচ্চাভিলাষী মুসোলিনি ১৯২২ সালে ন্যাশনাল ফ্যাসিস্ট পার্টি থেকে নির্বাচন করে ইতালির ৪০তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অধিষ্ঠিত হন। তাঁর বিশাল প্রশাসনিক ভবনের উপরে তিনি স্থাপন করেছিলেন নিজের অতিকায় মুখাকৃতি। এর মধ্যেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। হিটলারের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেন তিনি। মুসোলিনি ১৯৪০ সালে অক্ষশক্তির পক্ষে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগদান করেন। ১৯৪৩ সালে সিসিলিতে ক্ষমতাচ্যুত হলে তাকে বন্দি করা হয়। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে জার্মান সেনাদের কারসাজিতে মুক্তি পান মুসোলিনি। ১৯৪৫ সালের ২৭ এপ্রিল সুইজারল্যান্ডে পালানোর সময় ইতালির একটি ছোট গ্রামে কমিউনিস্ট প্রতিরোধ বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন তিনি। পরদিন তার সহচর কারা পেটাচি ও তার ১৫ সহযোগীসহ প্রত্যেককে গুলি করে হত্যা করা হয়। তোমাদের জেনে রাখা ভাল এই তিনিও শেষ রক্ষা পাননি।

চতুর্থত —-
জোসেফ স্ট্যালিন একজন রুশ সমাজতন্ত্রী রাজনীতিবিদ। তিনি ১৯২২ থেকে ১৯৫৩ পর্যন্ত দীর্ঘ ৩১ বৎসর সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সচিব ছিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাসে এই সময়ে স্ট্যালিনের নেতৃত্বে প্রচলিত রাজনৈতিক মতবাদ ‘স্ট্যালিনবাদ’ নামে পরিচিত। ধীরে ধীরে স্ট্যালিন ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে নেন এবং পার্টির নেতা হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নের শাসনক্ষমতা কুক্ষিগত করেন। তার শাসন আমলে অর্থনৈতিক উত্থান-পতনের দরুন লাখ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষে মারা যায়। ১৯৩০ এর দশকে স্ট্যালিন নিজের ক্ষমতা শক্ত করার জন্য নিপীড়ন শুরু করেন। যার ফলে কমিউনিস্ট পার্টির শত্রু সন্দেহে প্রচুর মানুষকে হত্যা করা হয়। এবং সাইবেরিয়ার নির্যাতন কেন্দ্রে নির্বাসিত করা হয়। মুসলিমসহ রাশিয়ার অনেক জাতিগোষ্ঠীকে তাদের বসতবাড়ি থেকে উৎখাত করে অন্যত্র সরিয়ে দেয়া হয়। কমিউনিস্ট এই নেতা ১৫ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী। শুধুমাত্র ১৯৩২ থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত ৬০ লাখ মানুষ মারা যায় সরকারি বাহিনীর অত্যচারে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও সমাজতন্ত্রের শোচনীয় মৃত্যুর জন্য যে ব্যক্তিকে দায়ী করা হয় সেই স্ট্যালিন মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভুগছিলেন। জীবনের শেষ পর্যায়ে মস্তিষ্কের অসুস্থতাজনিত কারণে তিনি বিভ্রান্ত, বিকারগ্রস্ত ও বেপরোয়া একনায়ক শাসকে পরিণত হন। স্ট্যালিনের ব্যক্তিগত চিকিৎসক আলেকজান্দ্রার মিয়াসনিকভ এ তথ্য জানিয়েছে। তিনি বলেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের এ স্বৈরাচারের জীবনের শেষ বছরগুলোতে যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সবই বিকারগ্রস্ত অবস্থায়। তিনি ভালো-মন্দের বিবেচনাবোধ হারিয়ে ফেলেছিলেন। তিনি ‘অ্যাথারোসক্লেরোসিস’ নামক রোগে ভুগছিলেন। এ রোগে মস্তিষ্কের শিরায় চর্বি জাতীয় বস্তু জমে যায়। আর এ সমস্যাই তাকে মৃত্যুর পথে নিয়ে যায়। জোসেফ স্ট্যালিনের মৃত্যু হয় ১৯৫৩ সালে। তোমাদের বুঝে নেয়া দরকার এটা মানুষের
আত্মার অভিশাপ।

পঞ্চমত —-
রাজা মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভি ইরানের শেষ রাজা হিসেবে ক্ষমতায় ছিলেন ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৪১ থেকে ১১ ফেব্রয়ারি ১৯৭৯ সাল অবধি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন তার পিতা রেজা শাহর হাত ধরে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন তিনি। ক্ষমতায় বসে পাশ্চাত্য ও ইসরাইলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ও সুসম্পর্ক স্থাপন করে তিনি ইসলামিক অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার জন্য রাষ্ট্রের বিশাল একটি অংশের সমর্থন হারান। নানাবিদ অগ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত ও কমিউনিস্টসহ কিছু দলকে নিষিদ্ধ করে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে ভিন্নমত দলনে নিষ্ঠুরতার পথে অগ্রসর হন। কুকর্ম সম্পাদনে অন্যান্য সংস্থার চেয়ে এই গোয়েন্দা সংস্থাটি তার প্রধান হাতিয়ার ছিল। দমন-পীড়ন বাড়ানোর সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে জনগণের সাথে রাজার দূরত্ব। তার বিরুদ্ধে গড়ে উঠে শীক্তশালী প্রতিপক্ষ। সেই সূত্র ধরে তৈরি হয় রাজনৈতিক অস্থিরতা। অস্থিরতা একসময় রূপ নেয় গণঅভ্যুত্থানে। আর ১৯৭৯ সালের ১৭ জানুয়ারি তিনি দেশ ত্যাগে বাধ্য হন। ইরানি রাজতন্ত্র আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হয় এবং বিপ্লবী ইসলামিক নেতা ইমাম খোমেনীর নেতৃত্বে ইরানকে একটি ইসলামী প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয়। মিসরে পালিয়ে গেলে আনোয়ার সাদাত তাকে আশ্রয় প্রদান করেন। নির্বাসিত অবস্থায় তিনি মাত্র ৬০ বছর বয়সে কায়রোতে মারা যান ২৭ জুলাই ১৯৮০ সালে। কুকর্মের রেশ ধরে মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলাভির ছোট ছেলে আলী রেজা পাহলাভি (৪৪) বোস্টনে আত্মহত্যা করেন। তার এই মৃত্যুকে সাবেক পারস্য রাজপরিবারের সর্বশেষ বিয়োগান্তিক ঘটনা বলে আখ্যায়িত করা হয়। পিতা মারা যাওয়ার পরের বছরই ছেলের মৃত্যু হয়। রাজার ছোট মেয়ে লিলা পাহলাভিকে ২০০১ সালে লন্ডনের একটি হোটেলে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। অতিরিক্ত মাদক সেবনে তার মৃত্যু হয়। জেনে রাখ এসবই পাপের প্রায়শ্চিত্ত।
ষষ্ঠত —–
রোমানিয়ার কমিউনিস্ট নেতা নিকোলাই চসেস্কু। তিনি ইতিহাসে একজন একনায়ক হিসেবে কুখ্যাত। ১৯১৮ সালের ২৬ জানুয়ারি রোমানিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন চসেস্কু। রাজনৈতিক জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ১৯৬৭ সালে কমিউনিস্ট রোমানিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ক্ষমতায় আসেন চসেস্কু। তিনি সুশাসক হওয়ার খ্যাতি অর্জন করতে পারেননি। ১৯৮৯ সালে তার বিরুদ্ধে বুখারিতে গণবিক্ষোভ শুরু হয়। আর সেই বিক্ষোভ দ্রুত পূর্ব ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলন ঠেকাতে পাগল হয়ে উঠেন চসেস্কু। আর সেজন্য তিনি গণহত্যা, গণগ্রেফতারসহ স্বেচ্ছাচারী আচরণ শুরু করেন। তবে এতকিছুর পরও শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেননি তিনি। ঐ বছর ডিসেম্বরেই ক্ষমতাচ্যুত হন নিকোলাই চসেস্কু। মাত্র ২ ঘণ্টার বিচার শেষে স্ত্রীসহ মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হয় রোমানিয়ার কসাই খ্যাত নিকোলাই চসেস্কুকে। এটাই ছিল স্রষ্টার বিচার ।

সপ্তমত —-
ক্ষমতায় এসেই পলপট নামের কমিউনিস্ট শাসক সমাজতন্ত্র কায়েম করেন। পলপট ছিলেন কম্বোডিয়ার সমাজতন্ত্রের জন্য আন্দোলনকারী খেমাররুজ বাহিনীর প্রধান। ১৯৬৩ সাল থেকে ১৯৯৮ সাল অর্থাৎ তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি খেমাররুজ বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন। ১৯৭৫ সালে কম্বোডিয়ার ক্ষমতা দখল করেন পলপট এবং একনায়করূপে আবির্ভূত হন। তারপর নানাবিধ সংস্কারের নামে পলপট সরকার ভয়ঙ্কর এক হত্যাযজ্ঞে লিপ্ত হয়। গণহত্যা চলাকালীন নমপেন শহরের পাশ দিয়ে বয়ে চলা মেকং নদীটার জল হয়ে উঠেছিল রক্তাক্ত। তার আমলে শহর থেকে মানুষকে জোর করে গ্রামে পাঠিয়ে দেয়া হয় চাষাবাদ করার জন্য। কমিউনিস্ট বাহিনীর অত্যচার, অপুষ্টি, দুর্ভিক্ষ, স্বাস্থ্যসেবা না পাওয়া প্রভৃতি কারণে কম্বোডিয়ার প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ মারা গিয়েছিল। কমিউনিস্ট শাসক পলপট ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সাল অবধি ৫ বছরে প্রায় ২৫ লাখেরও বেশি মানুষ হত্যা করে। গণহত্যায় অতিষ্ঠ হয়ে ভিয়েতনামী সৈন্যরা কম্বোডিয়ায় অনুপ্রবেশ করে। ১৯৭৯ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত জঙ্গলে থেকেই স্বঘোষিত শাসক ছিলেন পলপট। ১৯৯৮ সালে বিদ্রোহী খেমাররুজদের হাতে গৃহবন্দি হয়ে শেষ পর্যন্ত বন্দি অবস্থায় স্ট্রোকে মারা যান। তোমাদের তা ভাল জেনে রাখা দরকার, “পাপের মৃত্যু নেই”।

অষ্টমত —–
১৯৭১ সালে নর-পিচাশ হিসাবে খ্যাত ইদি আমিন উগান্ডায় সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখল করেন । উগান্ডার কসাই বলে তিনি সমধিক খ্যাত। ১৯৭৯ সালে তাঞ্জানিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ বাধলে ক্ষমতার অবসান হয়। প্রায় তিন লাখ মানুষ মারা যায় তার হাতে। তিনি ক্ষমতান্ধ মানসিক পাগল ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। হিটলারের আদর্শে অণুপ্রাণিত এই শাসক একই সাথে ছিলেন এন্টি হোয়াইট বা শ্বেতাঙ্গবিরোধী বর্ণবাদী এবং এন্টি এশিয়ান। জাতিগত বিশুদ্ধতার নামেই প্রায় ষাট হাজার এশিয়ান হত্যা করেন তিনি। রক্তাক্ত দমন-পীড়নে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হয়ে রয়েছে তার শাসন। শেষ সময়ে সৌদি আরবের জেদ্দার কিং ফাহাদ হাসপাতালে কোমায় সংজ্ঞাহীন ও মরণাপন্ন অবস্থায় ছিলেন। দেশের মাটিতে মরার আবেদন করলেও সে ইচ্ছা পূরণ হয়নি তার। ২০০৩ সালের ১৬ আগস্ট ইদি আমিনের মৃত্যু হয় এবং তাকে জেদ্দার রুয়াইস কবরস্থানে দাফন করা হয়।

নবমত —-
অগাস্তো পিনোশের ক্ষমতা দখলও সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়েই। তিনি চিলির ক্ষমতা দখল করেন ১৯৭৩ সালে। কিন্তু তার পরের সতের বছর দুর্বিষহ জীবন কেটেছে চিলির মানুষের। অগাস্তো পিনোশের শাসনকালে প্রায় বিশ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এখনও খোঁজ নেই অগণিত মানুষের। অত্যাচারিত হয়েছেন লক্ষাধিক মানুষ। কিন্তু ১৯৮৭ সালে গণভোটে গণতন্ত্র বিজয় লাভ করলে বিপাকে পড়ে যান পিনোশে। ১৯৯০ সালে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য হন তিনি। এবং ১৯৯৮ সালে ব্রিটেনে গ্রেফতার হন। অসুস্থতার জন্য ২০০০ সালে মুক্তি পেলেও ২০০৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন এই রক্তপিপাসু শাসক। তোমরা কী তার চেয়ে খারাপ ও ভয়ানক নও ?

দশমত —–
বাথ পার্টির সক্রিয় নেতা হিসেবে ১৯৬৮ সালে এক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইরাকের ক্ষমতা গ্রহণ করেন সাদ্দাম হোসেন। ১৯৭৯ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে ইরাকের প্রেসিডেন্ট হন। ইরাকের প্রেসিডেন্ট ও বাথ পার্টির প্রধান হিসেবে সাদ্দাম হোসেন ইসলামী আইনকে দূরে রেখে আরব জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ধর্মনিরপেক্ষ ও আধুনিক ইরাক গড়ে তুলতে প্রয়াস চালান। সাদ্দাম একদলীয় শাসন কায়েম করেন। তিনি তার মতের বিরুদ্ধের সব পক্ষকে নির্মূল করার উদ্যোগ নেন। এই নির্মূলের বিরুদ্ধে ছিল উপজাতীয় ও ধর্মীয় গোত্রগুলো। যারা স্বাধীনতা দাবি করেছিল। এ নিয়ে অবশ্য অভিযোগ আছে, কুর্দিবিদ্বেষী সুন্নী সাদ্দাম তার শাসনকালে (১৯৭৯-২০০৬ পর্যন্ত) কয়েক লাখ কুর্দি ও শিয়া মুসলিমকে হত্যা করেছেন। রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করে নিজ জনতাকে মারার রেকর্ড তার ছিল। বিভিন্ন সময় ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। নিজ ক্ষমতা রক্ষার স্বার্থে অপরিকল্পিত পরিকল্পনার মাধ্যমে ইরাককে সবসময় যুদ্ধময়দানে রেখে অপূরণীয় ক্ষতি করে গেছেন। একগুয়েমীর যুদ্ধে কলঙ্কজনক পরাজয়ের পরে তিকরিতের একটি খামারবাড়ি থেকে ইঁদূরের মতো গর্তে লুকানো অবস্থায় তাকে টেনে বের করে বন্দি করা হয়। পরবর্তীতে একসময়ের বন্ধু যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবে ইরাকের আইনে সাদ্দাম হোসেনকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। সাদ্দামের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ইরাকি সময় সকাল ৬টা ৬ মিনিটে ইরাকে সাদ্দাম হোসেনকে ফাঁসি দেয়া হয়। সাদ্দামের কর্মদোষে তার যুবক দুই পুত্রকেও নির্মম মৃত্যুর স্বাদ গ্রহন করতে হয় । তাদের মার্কিনিরা হত্যা করে। তোমাদের কী হতে পারে একটু ভেবে দেখা দরকার। পাপ কাউকে ক্ষমা করে না ।

একাদশতম ——
লিবিয়ার লৌহমানবখ্যাত মুয়াম্মার আল গাদ্দাফি ১৯৬৯ সালে ২৭ বছর বয়সের সেনাবাহিনীর কর্নেল হন। কিছু সহযোগী নিয়ে রক্তপাতহীন এক অভ্যুত্থানে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেন রাজা ইদ্রিসকে। ২০০৮ সালে আফ্রিকান শাসকদের এক সম্মেলনে গাদ্দাফিকে আফ্রিকার রাজাদের রাজাপথ ঘোষণা করা হয়। ভিন্নমতকে সহ্য করতে পারতেন না তিনি। তাই গোত্রগত প্রতিবাদী কন্ঠস্বরকে নিষ্ঠুরতার সাথে মোকাবেলার কলঙ্কজনক ইতিহাস সৃষ্টি করেন তিনি। দীর্ঘদিন একনায়কতন্ত্রের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে জনতা এক সময় ফুঁসে ওঠে গাদ্দাফির পারিবারিক শাসনের বিরুদ্ধে। গাদ্দাফী আন্দোলন দমনে সশস্ত্র পদ্ধতি গ্রহণ করলে জনগণও হাতে অস্ত্র তুলে নেয়। এ সময় জমানো ক্ষোভ নিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব বিক্ষোভকারীদের পাশে দাঁড়ায়। ন্যাটোর উপর্যুপরি হামলা আর জনতার সশস্ত্র গ্রুপ এনটিসির দৃঢ়কল্পের কাছে হার মানেন গাদ্দাফি। পলায়ন পথে এনটিসির হাতে ধরা পড়েন গাদ্দাফি। চার দশকের জমানো ক্ষোভ জনতা ঢেলে দেয় গাদ্দাফির শরীরের উপর। চড়-থাপ্পর, কিল-ঘুষি, জুতাপেটা করে এবং বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে অবশেষে গুলি করে হত্যা করে এক সময়ের পৃথিবী কাঁপানো ক্ষমতালোভী গাদ্দাফিকে। আর গুঁড়িয়ে দেয়া হয় শত অপকর্ম ও ভোগবিলাসের সাক্ষী তিলোত্তমা রাজপ্রাসাদকে। সাদ্দামের মতো গাদ্দাফিও অজানালোকে সাথে করে নিয়ে যান তরুণ বয়সের নিজ ছেলেমেয়েদের। আর আন্দোলন দমনে অংগুলি নির্দেশ করে যে ছেলে হুঙ্কার ছাড়তো সেই ছেলের আংগুল কেটে দিয়ে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে এনটিসি । ইহা কী পাপের প্রায়শ্চিত্ত নহে ?

সর্বশেষে —-
যুগে যুগে ক্ষমতালোভী রাষ্ট্রনায়করা শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেননি। তাই ক্ষমতার মোহে অন্ধ নাহয়ে জনগণের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য কাজ করে যেতে পারলে বরং ক্ষমতা আপনা আপনি স্থায়ী হয়। যার জ্বলন্ত প্রমাণ ইতিহাসেই রয়েছে। তাই সুচি এবং সেনাপ্রধানকে বলছি –ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়া তোমাদের দরকার, কারণ তোমরা ক্ষমতা আর জাতিগত হিংসায় উন্মাদ হয়ে মানুষের জীবন, মানুষের রক্ত আর মানুষের ইজ্জত নিয়ে হুলি খেলছো । মানুষকে কেটেকুটে উলঙ্গ করে ধর্ষন করে অবশেষে আগুন দিয়েয়ে পুড়িয়ে উল্লাস করছো ! এখনও সময় আছে ঠিক হয়ে যাও নতুবা তোমাদের ধ্বংশ অনিবার্য ও পৃথিবীর নির্মোহ সত্য থেকে তোমাদের ক্ষমা নেই । আর তা পাবেও না ।

 

 লেখক :: শমশের আলম, সমাজ গবেষক