শিক্ষামন্ত্রী’র পদত্যাগ সমাধান নয় : তাতে অপকর্মে লিপ্তরাই উৎসাহিত হবে

আতাউর রহমান ::

পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে দেশ তোলপাড়। উদ্বিগ্ন অভিভাবকমহল, উদ্বিগ্ন সমগ্র জাতি। এই সুযোগে কেউ কেউ প্রশ্ন ফাঁসের জন্য মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়ের পদত্যাগ দাবি করছেন। ভাবখানা যেন এই, শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করলেই নাকি সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তাহলে শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় কি প্রশ্ন ফাঁসের জন্য দায়ী? আর তাই যদি হয় তাহলে তো অনেক কথাই বলার আছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায়ে যারা গ্রেফতার হয়েছেন, তাদের সাথে শিক্ষামন্ত্রীর কী কোন যূগসুত্র আছে? নাকি মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীকে টার্গেট করেই এ অপকর্মগুলো তাদেরকে দিয়ে কেউ না কেউ করাচ্ছে। এর নেপথ্যে কারা কলকাঠি নাড়াচাড়া করছে। এই সংঘবদ্ধ চক্র কী সিলেট বিদ্বেষী? নাকি দেশ বিদ্বেষী? ওরা কারা? ওরা কি শিক্ষামন্ত্রীর নীতির কাছে পরাজিত কোন শক্তি! নাকি শিক্ষামন্ত্রী তাদের কোনরুপ কাজে বাঁধা হয়ে দাড়িয়েছেন! যার কারণে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ছাড়া তারা আর কোন সমাধান খুঁজে পাচ্ছে না। এরকম নানা প্রশ্ন সামনে টেনে আনা যাবে। আর শিক্ষামন্ত্রীর আসনে কাকে বা বসালে আর প্রশ্নপত্র ফাঁস হবে না। আর পদত্যাগ নাটকে সকল ষড়যন্ত্র বন্ধ হয়ে যাবে? সে-ই নাম ও-তো কেউ বলছে না! কে সে-ই ব্যক্তি? এসব টানাহেঁচড়া করে ভবিষ্যতে কোনো শিক্ষামন্ত্রীই আর নিরাপদ থাকতে পারবেন না! তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। শিক্ষামন্ত্রী’র পদত্যাগ কোন সমাধান নয়; তাতে অপকর্মে লিপ্তরাই বারবার উৎসাহিত হবে। শিক্ষামন্ত্রী কি নিজে প্রশ্ন পত্র ফাঁস করতে গেছেন, না কি কোন সচিব গেছেন? কে প্রশ্নপত্র ফাঁস করেছে খুঁজে বের করতে হবে। এ কথাটি আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঠিকই বুঝেছেন, তাই হয়তো শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদকে অভয় দিয়ে সামনে এগিয়ে চলার ইংগিতও দিয়েছেন।

আসলে সরকার বিরোধী একটি সংঘবদ্ধ চক্র শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ব্যাপক সাফল্য ও সরকারের বহুমুখি অর্জনকে ম্লান করে দিতে তৎপর। রাষ্ট্রের সক্ষমতাকে তারা যেমন প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাচ্ছে তেমনি ভবিষ্যত প্রজন্মকে বিভ্রান্ত ও নষ্ট করার প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ নিয়ে তারা মাঠে অবর্তীণ হয়েছে। এ অবস্থায় ভবিষ্যত প্রজন্মকে রক্ষার জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে আমাদেরকে এই দুস্কৃতিকারীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।

এ ধরনের অপকর্মে লিপ্ত আরেক শ্রেণির অনেকে প্রশ্ন ফাঁসের জন্য শিক্ষকদের দিকে তীর নিক্ষেপের চেষ্টাও করেন। প্রশ্ন প্রণয়ন ও বিতরণের বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষক সংশ্লিষ্টতা থাকায় হয়তো তারা এ অভিযোগ উত্থাপন করছেন। প্রশ্ন ফাঁসের কোনো পর্যায়ে কোনো শিক্ষকের সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা তা আমার জানা নেই। তবে যদি থেকে থাকে তাহলে বিষয়টি অত্যন্ত লজ্জাজনক। শিক্ষক মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে সম্মানিত। সুতরাং কোনো শিক্ষক এই অপকর্মে জড়িত হলে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও কাম্য।

প্রশ্ন ফাঁসের জন্য বিতরণ পর্যায়ে কোন দূর্বলতা কী নেই! সাধারণভাবে পরীক্ষা গ্রহণ পর্যন্ত প্রশ্ন প্রণয়ন, মুদ্রণ ও বিতরণ- এ তিনটি ধাপে পরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। কিন্তু মুদ্রণ, প্যাকেটজাতকরণ ও সংরক্ষণ পর্যায়ও সন্দেহের উর্ধ্বে নয়। কারণ, সকাল ৯.৩০ এর মধ্যে সকল পরীক্ষার্থীকে হলে ঢুকতে হয়। তারপর প্রশ্ন খোলা হয়। তাহলে কেন্দ্রের প্রশ্ন হলে ঢুকার আগে পরীক্ষার্থী কীভাবে পাবে সে বিষয়েও প্রশ্ন থেকে যায়। তাহলে প্রশ্ন ফাঁস হবে কী করে? এক্ষেত্রে প্রেসে প্রশ্ন প্রেরণ, প্রশ্ন মুদ্রণ, প্যাকেটজাতকরণ ও সংরক্ষণ পর্যায়ের দিকেও নজর দিতে হবে এবং এ পর্যায়গুলোকে বিশেষ নজরতারিতে রাখতে হবে। আসলে প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি কুচক্রীমহলের অনেক পরিকল্পিত একটি কাজ। এটা সরকারের সফলতাকে ম্লান করতে শক্তিশালী কোনো সিন্ডিকেটের কাজ। সবাইকে সতর্ক ও সোচ্ছার হতে হবে এই চক্রের বিরুদ্ধে এবং স্ব স্ব অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল নাগরিকের ভূমিকা পালন করতে হবে।

পাবলিক পরীক্ষা ছাপানো কোন প্রশ্নপত্র শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন কোন দপ্তরে( মাউশি/ শিক্ষাবোর্ড/ এনসিটিবি) যায় না, থাকে না । ডিজিটাল যুগে এসে ১৯৬০ এর দশকের প্রযুক্তিতে প্রশ্নপত্রের ছাপা এবং প্যাকেটজাত হয় বিজিপ্রেসে । সেখান থেকে পাঠানো হয় জেলার ট্রেজারিতে । জেলা প্রশাসক তাঁর সুবিধাজনক সময়ে উপজেলা ট্রেজারি, থানায় প্রেরণ করেন । পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত জেলা/ উপজেলা প্রশাসনের হেফাজতে প্রশ্নপত্র সংরক্ষিত থাকে । এই সংরক্ষণের স্হানগুলো আরও নিচ্ছিদ্র করতে হবে।
এসব কাজে হরেক পেশার মানুষের ছোঁয়া লেগে আছে। এসব কার্যে ক্রমাগতভাবে ব্যর্থ ও বিতর্কিতদেরকে সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব হতে সরিয়ে দিতে হবে। এই ধরণের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ, দায়িত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাত বিষয়ে দায়িত্ব পালনে দক্ষ ও ন্যায়পরায়ণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে পদায়ন করা যেতে পারে।

আর প্রশ্ন মুদ্রণ, প্যাকেটজাতকরণ ও সংরক্ষণ পর্যায়ে জড়িত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের তালিকা গোয়েন্দা সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা প্রয়োজন যেন তারা তাদের উপর নজর রাখতে পারেন। আর জড়িতদেরকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে দ্রুত চিহ্নিত করে তাদেরকে বিশেষ ট্রাইবুনালে বিচারের মাধ্যমে সর্বোচ্চ দন্ড প্রদান করার উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার।

শুধুমাত্র শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়কে অভিযুক্ত করে বা তার পদত্যাগ চেয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না। তাতে বরং অপকর্মে লিপ্তরাই বারংবার উৎসাহিত হবে।

লেখক: সভাপতি – বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব, সিলেট।