অনুমতির গণতন্ত্র সংবিধান সাংঘর্ষিক ?

সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি সমূহ হচ্ছে (১) বাঙ্গাঁলী জাতীয়তাবাদ, (২) গণতন্ত্র, (৩) সামজিক ন্যায় বিচারের অর্থে সমাজ তন্ত্র এবং (৪) ধর্মনিরপেক্ষতা। প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র” যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে। মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহন নিশ্চিত হইবে। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের জনগন স্বাধীনভাবে তার মতামত প্রকাশ করবে। তাঁর মতের প্রতি জনগণকে উদ্ভুদ্ধ করবে। উদ্ভুদ্ধ জনগন একত্রিত হয়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন কার্যক্রমের সমালোচনা করবে। ভুলক্রটি তুলে ধরবে শক্তিশালী বিরোধী দল। এখান থেকেই নির্বাহি বিভাগ অনেক ক্ষেত্রে সংশোধন হবে এবং সমাজে ন্যায় বিচার তথ্য আইনের শাসন প্রতিষ্টিত হবে। রাষ্ট্রে যখনই আইনের শাসন প্রতিষ্টিত হবে, তখনই দেশ এগিয়ে যাবে। বিশ্বের মানচিত্রে মর্যাদাশীল জাতি হিসাবে পরিচিতি লাভ করবে। সরকার পাবে তার গণতান্ত্রিক আচরনের জন্য বিশ্বের দরবারে যথাযত মর্যাদা এবং বিরোধী দল পাবে গঠনমূলক আচরনের জন্য মর্যাদাশীল আসন। এটাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূলনীতি।
সরকারের চরিত্র এক ও অভিন্ন হতে হবে। বিরোধী দল যেন জনগনকে ভুল ম্যাসেজ দিতে না পারে। পাকিস্তান আমলে অর্থাৎ ১৯৭০ সালে যখন আওয়ামীলীগের কর্নধার বঙ্গঁবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে যখন নির্বাচন অনুষ্টিত হয় তখন রাষ্ট্রের জনগন স্বাধীন ভাবে তাঁর মতামত প্রকাশ করতে পেরেছিল। স্বাধীনতার ভিত্তি রচিত হয়েছিল সেই নির্বাচনে বিশ্ব সম্প্রদায় নির্বাচনকে স্বাগত জানিয়েছিল কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক গোষ্টী সেই নির্বাচনকে স্বাগত না জানিয়ে জনগনকে দমিয়ে রাখার নীতি গ্রহন করে বিধায় পূর্ব পাকিস্তানে তাদের কবর রচিত হয়। কেননা পূর্ব পাকিস্তানের সুস্থ বিবেক সম্পূর্ন জনগনের ৯৯.৯৯% জনগন শেখ মুজিবুর রহমান সাহেবের নেতৃত্বকে স্বাগত জানিয়েছিল। পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক গোষ্টীর অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানীদের দাবী যৌক্তিক সেটি প্রমানীত হয়েছিল। স্বৈরাচারি শাসক গোষ্টী ১৯৭১ সালে ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানের বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্দানে জনসভা করতে বাধা দেয়নি। সেই ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষন শুনার জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষ একত্রিত হয়েছিল। বঙ্গঁবন্ধু বলেছিলেন আপনাদের অধিকার প্রতিষ্টায় যার যা কিছু আছে তা নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ার জন্য জনগন উদ্ভুদ্ধ হয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়ে। লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ দেয়। দেশ স্বাধীন হয়। পাকিস্তানী শাসক গোষ্টি আত্ম সমর্পন করে। দেশের সংবিধান রচিত হয়। মূলনীতি হিসাবে ঘোষনা করা উপরোক্ত ৪টি নীতি। কিন্তু হায়! ১৯৭৫ সালে বঙ্গঁবন্ধু “বাকশাল” গঠন করলেন। ইচ্ছায় হউক অনিচ্ছায় হউক রাষ্ট্রের সকলকে বাকশালের সদস্য হওয়ার জন্য আহবান জানালেন। সদস্য হলেন কিন্তু রাষ্ট্রের সাধারণ জনগন বঙ্গঁবন্ধুর সেই উদ্যোগকে ভাল চোখে গ্রহন করেনি। সাধারণ জনগন রাস্তায় নামিয়ে উল্লাস প্রকাশ করেনি। বঙ্গঁবন্ধু জনগনের ক্ষোভকে বেশীদিন দমিয়ে রাখতৈ পারলেন না। ১৯৭৫ সালে ১৫ই আগষ্টে স্বপরিবারে নিহত হলেন। প্রতিবাদ করেনি সাধারণ জনগন। তখনকার বাকশালের নেতৃত্বে যারা ছিলেন তারা একে একে মুশতাক সরকারে যোগদান করল, ক্ষমতার স্বাদ নিল। পদ-পদবী বহাল তবিয়তে ছিল। সেনা বাহিনী, রক্ষিবাহিনী, বিমান বাহিনী, নৌ বাহিনী সবই ছিল। কেহ বজ্রকন্ঠ নিয়ে প্রতিবাদ করেনি। কৌশলী উত্তর পরিস্থিতির স্বীকার। সাধারণ জনগন নেতার প্রতি যে আকর্ষন ছিল আজ আর সেই আকর্ষন নেই। সুতরাং কি নির্মম ইতিহাস। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া কি আমাদের কাম্য নহে ? গনতন্ত্র নির্বাসিত হল। জনগন তার ভোটের অধিকার হারাল। স্বৈরাচারি স্বেচ্ছাচারি শাসন প্রতিষ্ঠিত হল অনেকটি বছর। অনেক আন্দোলন সংগ্রাম আবার এদেশের জনগনকে করতে হল। স্বৈরাচারি শাসক গোষ্টী তো সভা করিতে বাধা দেয়নি। বহু দলীয় গণতন্ত্র চালু হলো। আবার ছাত্র জনতা একত্রিত হল অধিকার প্রতিষ্টার সংগ্রামে! এক পর্যায়ে সফল হল। ১৯৯০ সালে গনঅভ্যুথান হল। স্বৈরাচারি সরকারের পতন ও পচন হল। আমরা সম্মিলিতভাবে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বরকে গনতন্ত্রমুক্ত দিবস হিসাবে পালন করি। শহীদ নূর হোসেন, ডাঃ সামছুল আলম খান মিলন সহ অনেককে স্মরণ করি। তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। তবে বর্তমানে পালনের কৌশল ভিন্নভাবে! জনগন কিন্তু সে কৌশলী পালনকে ভালভাবে দেখেনি। দেখবেও না। কারন জনগনের চোখ মুখ খোলা। সাধারণ আমজনতা পদ-পদবীর তোয়াক্কা করে না। যখন তাদের ক্ষোভ বিস্ফোরিত হবে, তখন শেষ রক্ষা হবে না।
আমরা স্বাধীনতা লাভ করেছি। স্বাধীনতার বয়স প্রায় ৪৭ বছর। কিন্তু চরিত্র বদলাই নি। ক্ষমতায় যে দলই গেছে স্বাভাবিকভাবে ক্ষমতা ত্যাগ করতে রাজি হয়নি, যেমনটি ১৯৭০ সালে হয়েছিল। নানা যুক্তি, কৌশলের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতায় থাকতে চায় এবং তাদের ক্ষমতায় থাকার জন্য তাদের স্বতেজ বিবেক নির্বোধ বালকের মত কথা বার্তা বলে জনগনকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। কিন্তু জনগন!
শাসক গোষ্টী সংবিধানের দোহাই দিতেছে, সংবিধানে তো গণতন্ত্রের কথা বলা হয়েছে। বাক স্বাধীনতা, ব্যক্তি স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম এগুলোর কথা বলা হয়েছে। রাষ্ট্রের যে কোন সংগঠন নিয়ম নীতি, আইন শৃংখলা মেনে সভা সমাবেশ করবে। এটাই স্বাভাবিক। রাষ্ট্র যন্ত্র সহযোগীতা করবে। যেমনটি ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দান বর্তমান সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে ঐতিহাসিক সভা করতে সহযোগীতা করেছিল রাষ্ট্র। আজ স্বাধীনতা লাভের ৪৭ বছর পর বিভিন্ন দলকে সরকারের অনুমতির জন্য এখানে সেখানে যেতে হয়। আমি রাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিক হিসাবে লজ্জাবোধ করি। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর কি দেখতে পেলাম! কিছুদিন পূর্বে একটি নিবন্ধিত দল সভা করার অনুমতির জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী মহোদয়ের সাথে দেখা করলেন। মন্ত্রী মহোদয় পরিষ্কার বলে দিলেন ডি.এম.পি কমিশনের কাছে যেতে। এখন আমার প্রশ্ন রাষ্ট্র কি রাজনীতিবিদরা পরিচালনা করেন না রাষ্ট্রের কর্মচারী ? কি লজ্জা ! কি লজ্জা!

লেখকঃ এডভোকেট মোঃ আমান উদ্দিন, সভাপতিঃ সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন),বিয়ানীবাজার উপজেলা শাখা।