বিয়ানীবাজারের দুবাগে একটি পরিবারকে সমাজচ্যুত করলো মাতব্বররা স্কুল থেকে বের করে দেয়া হয়েছে দুই কোমলমতি শিশুকে

বিয়ানীবাজারকণ্ঠ.কম ::

বিয়ানীবাজার উপজেলার দুবাগ ইউনিয়নে একটি পরিবারকে সমাজচ্যুত (একঘরে) করে দিয়েছে স্থানীয় মাতব্বররা। এর এই আদেশ কার্যকর করতে স্থানীয় ইউপি সদস্য ওই বাড়ীতে গিয়ে ঘরে থাকা পুরুষ মহিলাদের ডেকে গ্রামের স্কুল, মসজিদে যেতে বারণ করে এসেছেন। বৃহস্পতিবার সকালে ওই ইউপি সদস্যের কথায় কান না দিয়ে শিক্ষার্থীদের স্কুলে পাঠালে স্কুল থেকে শিক্ষার্থীদের বাড়ীতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। উপরোক্ত অভিযোগ করেছেন উপজেলার পাঞ্জিপুরি গ্রামের তোতা মিয়া। এ ব্যাপারে স্থানীয় ইউপি সদস্য মউর উদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেছেন, গ্রামের সকলের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ইউপি সদস্য হিসেবে তিনি তোতা মিয়ার বাড়ীতে গিয়ে তাদের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দিয়ে এসেছেন।
বৃদ্ধ তোতা মিয়া অভিযোগ করে বলেছেন, তিনি ও তার পরিবারের লোকজন পাশ^বর্তী ঘরের দুদু মিয়া ও সাহাব উদ্দিন সাধুর পরিবার কর্তৃক দীর্ঘ দিন থেকে শারিরিক ও মানষিক নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছেন। তাদের পরিবারে কোন পুরুষ লোক না থাকায় প্রতিনিয়ত প্রতিবেশিদের দ্বারা শারীরিক ও মানষিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন। সম্প্রতি তারা তোতা মিয়ার ঘরে অতর্কিত হামলা চালায়। এ সময় হামলাকারীরা তার স্ত্রীকে মারধর করে। এ নিয়ে গ্রামের মুরব্বীয়ানদের দারস্ত হলে তারা সকলে বসে বিষয়টি আপোশ মিমাংসার জন্য বলেন। এ লক্ষ্যে উভয় পক্ষের কাছ থেকে স্থানীয় মুরব্বীগণ আমানত গ্রহণ করেন। এরপর বিচার করে দিবে দিচ্ছেন বলে সময় পার করতে থাকেন। এরই মধ্যে গত সোমবার রাতে আবারো তোতা মিয়ার ঘরে হামলার ঘটনা ঘটে। এ বিষয়ে তিনি থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। পুলিশ মঙ্গলবার ঘটনাস্থল পরিবদর্শন করে। এলাকায় পুলিশ কেন গেল এই অভিযোগে বুধবার রাতে তোতা মিয়ার পরিবারকে সমাজচ্যুত (একঘরে) করে দেয়া হয়। তোতা মিয়া জানান, তিনি, তার স্ত্রী ও এক পুত্র বধু নাতি নাতনিসহ যখন রাতের খাবার খেয়ে ঘুমাতে যান ঠিক তখন স্থানীয় ইউপি সদস্য মউর উদ্দিন তার বাড়ীতে গিয়ে ডেকে তুলে তাদেরকে এক ঘরে করে দেয়া হয়েছে বলে জানান এবং পরিবারের সকলকে সামাজিক সকল কর্মকান্ড থেকে বয়কট করা হয়েছে জানিয়ে বলেন, শিশুরা যাতে গ্রামের স্কুলে না যায়।
তোতা মিয়া বলেন, আমি ইউপি সদস্যের মৌখিক নির্দেশ শুনার পর আমার আত্মীয় স্বজনকে বিষয়টি অবগত করি। তারা আমাকে জানান, দেশের প্রচলিত আইনে এক ঘরে করে দেওয়ার নিয়ম নেই। স্কুল কলেজে যাওয়া থেকে বিরত রাখার ক্ষমতা তাদের নেই। তাই আমার নাতি নাতনিকে সকালে স্কুলে পাঠাই। কিছুক্ষন পর আমার নাতনি পাঞ্জিপুরি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেনীর ছাত্রী আফরিন আক্তার মাহিয়া স্কুল থেকে কেঁদে কেঁদে বাড়ীতে আসে। এ সময় সে জানায় তাকে স্কুল থেকে বাহির করে দেওয়া হয়েছে। এর কিছুৃক্ষন পরে কুশিয়ারা দ্বি পাক্ষিক উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেনীর ছাত্র আমার নাতি মিজানুর রহমান বাড়ীতে চলে আসে। সেও জানায় স্কুল কমিটির লোকজন তাকেও স্কুলে না আসার জন্য বলে তাড়িয়ে দিয়েছেন।
পাঞ্জিপুরি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেনীর ছাত্রী আফরিন আক্তার মাহিয়া এ প্রতিবেদকে জানায়, সে স্কুলে গেলে তাকে ক্লাস করার সুযোগ না দিয়ে বাড়ীতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। একই অভিযোগ করে কুশিয়ারা স্কুলের ৭ম শ্রেনীর ছাত্র মিজানুর রহমান। সে জানায়, স্কুল কমিটির লোকজন তাদেরকে সমাজচ্যুত করা হয়েছে জানিয়ে তাকে স্কুল থেকে বিদায় করে দেন এবং আর এই স্কুলে না আসার জন্য বলেন।
ইউপি সদস্য মউর উদ্দিনের সাথে প্রসঙ্গে কথা হলে তিনি তোতা মিয়ার পরিবারকে সমাজচ্যুত (একঘরে) করার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, আমি নিজে তোতা মিয়ার বাড়ীতে গিয়ে তা জানিয়ে দিয়ে এসেছি। সমাজচ্যুত করা আর বাচ্চাদের স্কুল-মসজিদে যায়াতাতে বাঁধা দান বেআইনী তা জানেন কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে মউর উদ্দিন বলেন, আমি আইনের বই পড়েছি। আইন মোতাবেক আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তাই প্রধানমন্ত্রী নিজে এলেও আমাদের এই সিদ্ধান্ত বাতিল করতে পারবেন না। তিনি বারবার দম্ভ করে একই কথা পুনঃব্যক্ত করেন। কিছুক্ষন পর ০১৭১৪৬২৮২১৬ নাম্বার থেকে ফোন করে পরিচয় না দিয়ে এই প্রতিবেদকের সাথে কথা বলেন জনৈক ব্যক্তি। তিনি প্রতিদবেদককে জানান, তাদের এ সিদ্ধান্ত বাতিলের ক্ষমতা কারো নেই। সাংবাদিকরা তাদের গ্রাম্য বিষয়ে নাক না গলানোর জন্যও সাশিয়ে ফোন রেখে দেন।
নির্যাতিত তোতা মিয়া জানান, প্রতিপক্ষের হাতে বার বার মার খেয়ে তিনি তার স্ত্রী ও পুত্র বধুকে রক্তাক্ত হতে হয়েছে। এলাকায় ন্যায় বিচার পাইনি বলে থানায় এসেছি। তিনি বলেন, সম্প্রতি তার স্ত্রীর উপর হামলা করে রক্তাক্ত করলে স্থানীয় মুরব্বীয়ানরা বিষয়টি আপোশ মিমাংসার উদ্যোগ নেন। মারধর খাওয়া এবং রক্তাক্ত হওয়ার পরও তাদেরকে বিচারের নামে স্থানীয় মসজিদের মুতায়ল্লী আলী হোসেনের কাছে ৫ হাজার টাকা আমানত রাখতে হয়েছে। ৪ মাস অতিবাহিত হলেও তিনি ন্যায় বিচার পাননি। পাননি তার আমানতের টাকাও।
বিষয়ে জানতে বিয়ানীবাজার উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান. পাঞ্জিপুরী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২ জন সহকারী শিক্ষাকর্মকর্তা যাচ্ছেন। ফিরে এলে বিস্তারিত জানা যাবে।
ওসি তদন্ত জাহিদুল হক জানান, তোতা মিয়ার আবেদনের প্রেক্ষিতে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।