কোটা : বিজয় আসুক কালোর বিপরিতে

// শান্তা ফারজানা//

সারাদেশে শুরু হয়েছে কোটা সংস্কার আন্দোলন। এই আন্দোলনে নিরন্তর যুক্ত হচ্ছে বিভিন্ন ন্তরের শিক্ষার্থীরা। তাদের কন্ঠে উঠে আসছে- ‘বঙ্গবন্ধুরর বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই, কোটা সংস্কার চাই।’ ‘নাতি পুতি কোটা বাতিল কর।’
কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে শাহবাগে এভাবেই প্ল্যাকার্ড নিয়ে আন্দোলনে সোচ্চার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও চাকরি প্রার্থীরা। কর্মসূচিতে বিক্ষোভকারীদের পাঁচ দফা দাবি : কোটা ব্যবস্থা সংস্কার করে ৫৬ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নিয়ে আসা, কোটায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে মেধা থেকে শূন্য পদে নিয়োগ দেওয়া, কোটায় কোনো ধরনের বিশেষ পরীক্ষা না নেওয়া, সরকারি চাকরিতে সবার জন্য অভিন্ন বয়সসীমা এবং চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় কোটা সুবিধা একাধিকবার ব্যবহার না করা।

একটি দেশে কোটা পদ্ধতি বরাদ্দ দেওয়া হয় সাধারণত অনগ্রসর জনগণকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য । সেক্ষেত্রে নারীদের জন্য ১০ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য পাঁচ শতাংশ এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য এক শতাংশ, এই ১৬ শতাংশ কোটা নিয়ে কারো কোনো দ্বিমত নেই। তবে ১০ শতাংশ জেলা কোটা, মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০ শতাংশ এভাবে সরকারী চাকুরীতে ২৫৭ ক্যাটাগরিতে কোটা চালু রয়েছে।

মূলত, কোটা প্রথা চালু হয়েছে পাকিস্তান পর্বে। তার বিস্তার ঘটেছে স্বাধীন বাংলাদেশে। অনগ্রসর অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের চাকরির ক্ষেত্রে ঠাঁই দিতে এই পদ্ধতি চালু হয়েছিল অনেক আগেই। তাতে মেধার প্রাধান্য হয়ত ততটা থাকত না। যুক্তি ছিল, রাষ্ট্র পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত করতে পারে না। তবে, কোটা পদ্ধতির কারণে কোটার বাইরে থাকায় যোগ্য ও মেধাবী অনেকেই নিয়োগ থেকে বঞ্চিত হয়। এসব পদ খালি থাকায় সরকার ও রাষ্ট্র মেধাবী এবং যোগ্যদের সেবা থেকে বঞ্চিত হয়। সরকারি চাকরি লাভের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে মুক্তিযোদ্ধা কোটা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা অনুযায়ী শুধু মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা নয় বরং তাদের নাতি-নাতনিরাও কোটা পদ্ধতির আওতায় পড়বে। তারই ধারাবাহিকতায় মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তরাধিকারীরা চাকরির ক্ষেত্রে সুযোগ পাচ্ছে। ৫৬ শতাংশ কোটা থাকায় সাধারণ চাকরি-প্রত্যাশীরা বৈষম্যের স্বীকার হচ্ছেন। এরপরও বিভিন্ন সময় কোটায় বিশেষ নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। যেমন: ৩২তম বিসিএস, বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক পদে বিশেষ কোটায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে উচ্চ শিক্ষা অর্জনের একমাত্র উদ্দেশ্য মানসম্মত সরকারি চাকরি লাভ। একটি চাকরি একটি পরিবারকে প্রতিষ্ঠা দেয়। ব্যক্তি জীবনকে উন্নতকরে। সকল যোগ্যতা থাকার পরেও একজন শিক্ষার্থী যখন তার আকাক্ষিত চাকরি লাভে ব্যর্থ হয় তখন সে হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়ে। অনেক সময় অন্ধকার জগৎ তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। প্রত্যেক শিক্ষার্থী তার অর্জিত শিক্ষা এবং বিবেক কাজে লাগিয়ে ন্যায়ভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে চায়। কিন্তু জীবিকা নির্বাহের ক্ষেত্রে ন্যায়ের রাস্তাগুলো যখন তার জন্য রুদ্ধ হয়ে যায় তখন সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি ঘৃণা জন্মে। এ ঘৃণা তাকে এমন কতগুলো কাজ করতে প্রলুব্ধ করে যার বদৌলতে শুধু ব্যক্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না বরং পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রও মারাত্মকভাবে হুমকির সম্মুখীন হয়। বর্তমান সময়ে দেশের ১৭ কোটি জনগণের মধ্যে প্রায় আট কোটিই বেকার। অতীতে বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে যে, কোটার প্রার্থী না পাওয়ায় ২৮তম বিসিএসে ৮১৩ জনের পদ শূন্য ছিল। একইভাবে ২৯তম-তে ৭৯২ জন, ৩০তম-তে ৭৮৪ জন, ৩১তম-তে ৭৭৩ জন, ৩৫তম-তে ৩৩৮ জনের পদ শূন্য ছিল। এই শূন্য পদ না রেখে সেখানে মেধা থেকে প্রার্থী নিয়োগ করা কি উচিত ছিল না?

দেশের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে এ সংখ্যক বেকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। সেগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করে বিপুলসংখ্যক জনশক্তির জন্য শ্রমবাজার সৃষ্টি করে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনয়ণ করা সম্ভব। কাজেই দেশে দেশের বাইরে বেকারদের এবং যোগ্যদের তাদের প্রাপ্য স্থানে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে দিতে পারলে দেশের সর্ববৃহৎ সমস্যার যেমন সমাধান হবে তেমনি দেশ অর্থনীতিকভাবেও গতিশীল হবে।

মানুষের মঙ্গল যে কাজের মধ্যে নিহিত সে কাজই যেন আমরা করতে পারি। রাষ্ট্র দেশের মেধাবীদের মেধা ধরে রাখতে কার্যকরী ভূমিকা গ্রহণ করুক সেটাই কাম্য। কোনো বিশেষ শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে যেন অন্য মানুষকে হুমকির দিকে ঠেলে দেয়া না হয়। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের বিষয়টি নিয়ে ‘পরীক্ষা নিরীক্ষা’ করবে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এ কথা বলেছেন। বিভিন্ন সময়ে কোটা পদ্ধতি নিয়ে ছাত্রদের পক্ষ থেকে দাবি উত্থাপিত হয়েছে এবং তাদের সমাধানের আশ্বাস দিয়ে শান্ত করা হয়েছে। তবে সমাধান কখনোই হয়নি। তাই সরকারের উচিত দক্ষতার সাথে এই কোটা সমস্যার সমাধান করা। তবেই বিজয় আসবে বিজয় হাসবে শত শত আলোকবর্তিকাসম মেধাবীদের ঠোঁটে…

আমরা চাই বিজয় আসুক, এই বিজয়ের রাস্তায় আমাদের অধিকার রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হোক বর্তমান ও আগামী…

লেখক : শান্তা ফারজানা : সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান, নতুনধারা বাংলাদেশ-এনডিবি ও সভাপতি, জাতীয় শিক্ষাধারা

 

 

বি:দ্র ::

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। বিয়ানীবাজারকণ্ঠ.কম এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে বিয়ানীবাজারকণ্ঠ.কম  আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।