সিলেটে নদীমাতৃক মানুষের প্রতিবাদ বন্ধন

‘নদী থেকে নির্বিচারে বালু উত্তোলন বন্ধ করো’ প্রতিপাদ্যে বিশ্ব নদী দিবস ২০১৮ কে সামনে রেখে সিলেটে নদীমাতৃক মানুষের প্রতিবাদ বন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে।

শনিবার (২২ সেপ্টেম্বর) সিলেটের হাওর-নদীর মিলনরেখায় অবস্থিত চেঙ্গেরখাল নদীর বাদাঘাট ব্রিজে বেলা ১১টা থেকে সুরমা রিভার ওয়াটারকিপার ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেট শাখার যৌথ উদ্যোগে ঘন্টাব্যাপী এই কর্মসূচি পালন করা হয়।

সুরমা রিভার ওয়াটারকিপার ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেট শাখার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিমের সভাপতিত্বে প্রতিবাদ বন্ধনে সারি ও গোয়াইন নদীর মিলিত প্রবাহ চেঙ্গেরখাল নদীর তীরের নদীমাতৃক মানুষেরা অংশগ্রহণ করেন ।

নদী আন্দোলনের সংগঠক আব্দুল করিম কিম সভাপতির বক্তব্যে বলেন, নদী ধ্বংসের অপকীর্তি সারা বাংলাদেশেই চলছে। এমন প্রেক্ষাপটে বিশ্বজুড়ে আগামীকাল ২৩শে সেপ্টেম্বর রোববার পালিত হবে বিশ্ব নদী দিবস। বাংলাদেশে এ বছর বিশ্ব নদী দিবসের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘নদী থেকে নির্বিচারে বালু উত্তোলন বন্ধ কর’। এই প্রতিপাদ্য সিলেটের প্রায় অধিকাংশ নদ-নদীর জন্য প্রযোজ্য। সুরমা-কুশিয়ারা বিধৌত শতনদীর সিলেট বিভাগে নদী ধ্বংস অতীতের সকল রেকর্ড ভাঙছে। ফলে আমাদের জীবন-জীবিকা, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও প্রাণ-প্রকৃতি আজ বিপন্ন। নদী থেকে বালি ও পাথর উত্তোলনের পাশাপাশি সম্প্রতি শিল্পদূষণ যুক্ত হয়েছে সিলেট বিভাগে। এদিকে চেঙ্গেরখাল নদীসহ সিলেটের অধিকাংশ নদী থেকে নির্বিচারে যেভাবে বালু উত্তোলন চলছে তা অবিলম্বে বন্ধ করা না গেলে এর খেসারত আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, চেঙ্গেরখাল নদীর স্বচ্ছ পানিপ্রবাহকে কাজে লাগিয়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের ৫০ বছরের টার্গেটে ৭শ ২৫ কোটি টাকার ওয়াটার প্লান্ট নির্মাণের প্রকল্প হাতে নিতে যাচ্ছে। এ অবস্থায় এই নদীর পানি প্রবাহকে হুমকিতে ফেলে যেভাবে বালু উত্তোলন চলছে তা অবিলম্বে বন্ধ করা দরকার।

প্রতিবাদ বন্ধনে অংশ নিয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জিয়া আহমেদ বলেন, চেঙ্গেরখাল নদীতে অপরিকল্পিত ও অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বালু উত্তোলনে দেশের অন্যতম মিঠাপানির জলারবন রাতারগুল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে ।

মহানগর আওয়ামী লীগের সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য আইনজীবী গোলাম সোবহান চৌধুরী বলেন, বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর ধারা ৫ এ বলা আছে (১) পাম্প বা ড্রেজিং বা অন্য কোন মাধ্যমে ভূ-গর্ভস্থ বালু বা মাটি উত্তোলন করা যাইবে না। (২) নদীর তলদেশ হইতে বালু বা মাটি উত্তোলনের ক্ষেত্রে যথাযথ ঢাল সংরক্ষণ সাপেক্ষে, সুইং করিয়া নদীর তলদেশ সুষম স্তরে (River Bed Uniform Level) খনন করা যায় এইরূপ ড্রেজার ব্যবহার করতঃ বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনা করিতে হইবে। (৩) উপ-ধারা (২) এর অধীন ড্রেজিং কার্যক্রমে বাল্কহেড বা প্রচলিত বলগেট ড্রেজার ব্যবহার করা যাইবে না।

তিনি আরও বলেন, ড্রেজিং মেশিন দিয়ে নদী থেকে বালি উত্তোলন করায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নদী ও পানি বিশেষজ্ঞদের মতামত ছাড়া বালু উত্তোলন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি ।

কৃষিবিদ মোজাদ্দেদ আহমেদ বলেন, ইচ্ছেখুশি বালি উত্তোলনের কারণে সিলেটের সুরমা-কুশিয়ারা নদীর তীরের কৃষি জমি বিলীন হওয়ার একাধিক ঘটনা ঘটেছে ।

প্রতিবাদ বন্ধনে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন পরিবেশকর্মী বদরুল ইসলাম চৌধুরী, নদীমাতৃক স্থানীয় মানুষের পক্ষে গোলাম কিবরিয়া, কামাল উদ্দিন ও আল আমিন।

প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসের চতুর্থ রোববার ‘বিশ্ব নদী দিবস’ পালন করা হয়। বাংলাদেশে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে এ দিবস উদযাপনের উপলক্ষে ৭০টির অধিক নদী, পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংগঠন ২২ সেপ্টেম্বর শনিবার বেলা ১১টায় ঢাকাস্থ বাহাদুর শাহ পার্ক থেকে সদরঘাট পর্যন্ত ‘নদীর জন্য পদযাত্রা’র আয়োজন করেছে।

উল্লেখ্য, ১৯৮০ সাল থেকে প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসের চতুর্থ রোববার বিশ্ব নদী দিবস পালন করতে শুরু করে ব্রিটিশ কলম্বিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি। এরপর ২০০৫ সাল থেকে জাতিসংঘের বিভিন্ন সহযোগী সংস্থা দিবসটি পালন করছে। ২০০৫ সালে জাতিসংঘ দিবসটি অনুসমর্থন করে।