বাবাকে জড়িয়ে কিছু অনুভুতি : মিলাদ মো. জয়নুল ইসলাম

বাবা শব্দটার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অনেক শব্দহীন বাক্য। বাবা বাড়িতে সব থেকে কম কথা বলা, মেজাজী, রাশভারী এক মানুষ। ভালোবাসার জায়গাটাও তার জন্য বেশি কিন্তু বলা হয়ে ওঠে না। আমার বাবাও ছিলেন একইরকম।

রফিকুল মুরছালীন (৭৬) আমার বাবার নাম। বিয়ানীবাজার পৌরশহরের কসবা গ্রামের সিরাজের গুষ্টিতে আমার বাবা জন্ম নেন। তাঁর ছোট বয়সে দাদাদের সহায় সম্পত্তি ছিল প্রচুর। সময়ের ব্যবধানে সহায়-সম্পত্তি কমতে থাকে। তখনকার সময়ে মেট্রিকুলেশন পর্যন্ত লেখাপড়া করেন তিনি। আমার বাবার হাতের লেখা ছিল অপূর্ব, তাঁর নিজ হাতে কোন কিছু ড্রাফট করলে সকলমহলে গ্রহণযোগ্য হতো। আমার ড্রাফটিং কৌশল বাবার কাছ থেকে শেখা। বয়স ও অসূস্থতার কারণে শেষ বয়সে বাবা অনেকটা নি:সঙ্গ ছিলেন। যদিও মা এবং নাতিরা তাঁকে সময় দিতেন। আমিতো সেই সকালে বের হয়ে গভীর রাতে বাড়ি ফেরা এক লোক। এরপরও রাতে যখন বসতঘরের গেট খুলতাম কিংবা গেট খোলার জন্য মোটর সাইকেল দিয়ে হর্ণ বাজাতাম, বাবা তখন জোর গলায় অন্যদের ডেকে গেট খুলে দেয়ার কথা বলতেন। গত ৩ অক্টোবর সকাল ৮.৩৫ মিনিটে তিনি আমাদের ছেড়ে গেছেন মহান সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্যে। এদিন বিকাল ৫টায় নিজগ্রামের জামে মসজিদে জানাযার নামাজ শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়। বাবার মৃত্যুতে অনেক স্বজন, শুভাকাংখী, বন্ধু, নিকটাত্মীয়, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, ব্যবসায়ীমহল থেকে আমি ও আমার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়েছে। তাঁদেও সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা।

আমার বাবার দীর্ঘ অসূস্থতাকালীন সময়েও বঙ্গবন্ধুর নৌকার জন্য ব্যকুল ছিলেন। টেলিভিশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কোন সংবাদ দেখার পর নড়েচড়ে বসতেন। শেষ সময় পর্যন্ত আওয়ামীলীগের একনিষ্ট সমর্থক ছিলেন। জীবদ্দশায় অসূস্থ অবস্থায় কোন আওয়ামী রতি-মহারতি তাঁকে দেখতে যাননি। এ নিয়ে আমার বাবার কোন ক্ষোভ ছিল কিনা জানা নেই। তবে এরকম রাজনীতিপ্রেমীদের জীবদ্দশায় দেখতে যাওয়ার সংস্কৃতি নেতাদের চালু করা দরকার। তবেই রাজনীতির প্রতি সাধারণের ভালোবাসা বাড়বে। এখনতো রাজনীতি ক্রমেই মলিন হচ্ছে, কেউ পাওয়া-না পাওয়ার দহনে পুড়ছে। যদিও আমার বাবার এরকম কোন দহন নেই। সারাটাজীবন নির্মোহভাবে আওয়ামীলীগ আর প্রয়াত আল্লামা ফুলতলীকে ভালোবেসে গেছেন।

একজন বাবার মূল সম্পদই হচ্ছে তাঁর সন্তান। আর সেই সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করার জন্য একজন বাবা কী না করেন। আমার বাবা আমাকে একটি পরিবার কিভাবে আগলে রাখতে হয়, তার শিক্ষা দিয়েছেন। বাবার অনুপ্রেরণায় আমার সব ছোট ভাই মাজহারুল ইসলাম মুরাদ উচ্চশিক্ষা গ্রহণে অষ্ট্রেলিয়ায়, ২য় ভাই রেজাউল ইসলাম ফোহাদ ওমানে ভালো চাকুরী করছে। সবার ছোট বোন সিলেট মেডিকেলের শেষ বর্ষের ছাত্রী। আমি সাংবাদিকতা ও ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছি। বাবা যেমন কখনো হারেননি, আমাকেও তেমনি পরাজিত না হওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। আমি শিরদাঁড়া করে পথচলি, পরিবার আগলে রাখি। আমার সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস হচ্ছেন বাবা। ভবিষ্যতের রাস্থায় যাত্রা শুরু করার ক্ষেত্রে বাবা হচ্ছেন অকৃত্রিম ভালোবাসায় তৈরি শক্তির লাঠি। যেটাকে আঁকড়ে ধরে আমরা পার করে দিতে চাই বাকীপথ।

ঊাবা-মা দুজনেই সন্তানের ভালো চান। আদর ভালোবাসার দিক থেকে দুজনেই সমান কিন্তু শাসনের কথাতে আমাদের বাবার মুখটাই আগে মনে পড়ে। বাড়িতে সব থেকে রাশভারী মানুষ বাবা। কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছেন কী, যে মানুষটা সারাদিন কষ্ট করে ক্লান্ত হয়ে বাড়িতে ফিরলেন তাঁর সেই ক্লান্তি কাদের জন্য। বাবা হয়ত অল্পতে রেগে যান আর তাই আমরা বাবার সঙ্গে কথা কম বলি কিন্তু দেখবেন-যে রাতে আপনার অনেক জ্বর ছিল আর আপনার মা মাঝরাতে আপনার পাশে ঘুমিয়ে গেছিলেন, তখন বাবা এসে আপনার জলপট্টিটা পাল্টে দিয়েছিলেন। আগের দিনে বাবার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক ছিলো খানিকটা দূরত্ব, খানিকটা সংকোচ ও খানিকটা ভীতি মেশানো শ্রদ্ধা। তবে সেই অবস্থা এখন আর নেই বললেই চলে। এখনকার সময়ে অনেক বাবাই সন্তানদের বন্ধুর মতো, একদম কাছের মানুষ। স্নেহশীল। কর্তব্যপরায়ণ। ডাক যাই হোক না কেনো। রক্তের সম্পর্ক বদলায় না। বদলায় না এই ডাকের আবেগও। এই ডাকটার মধ্যেই জরিয়ে থাকে পৃথিবীর সকল আবেগ ও ভালোবাসা। বাবা, এ জীবনে আর কখনো দেখা হবেনা…তবে তোমার প্রতি থাকবে গভীর শ্রদ্ধা ও আবেগ।

জীবন চিরায়ত বহমান। সকল হারানো কিংবা শোক-তাপের ঊর্ধ্বেও জীবন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। আর এই সত্যটাই চিরন্তন। ভালোবাসার বহতার কথা বলেছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি তাঁর পিতার শেষ অন্ত্যোষ্টিক্রিয়ার প্রার্থনায় বলেছিলেন, ‘বাবা আলোকের ন্যায়, সমিরণের ন্যায়, তাহা শিশুকাল হইতে আমাদিগকে নিয়ত রক্ষা করিয়াছে, কিন্তু তাহার মূল্য কেহ কখনো চাহে নাই!’

বাবা নামের এই মানুষটি পৃথিবীতে সবার বেশিদিন থাকে না। আমার বাবাও নেই, তাঁর জন্য সবাই দোয়া করবেন। আমিতো সারাক্ষণ দোয়ার চেষ্টা করবো-‘রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বা ইয়ানিছ ছাগিরা।’-লেখক-সাধারণ সম্পাদক, বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব।