শহীদ নাহিদ আমার প্রথম মিছিলের প্রেরণা

রুহুল আলম চৌধুরী উজ্জ্বল

ধর্মনিরপেক্ষ বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্য নিয়ে বহু ত্যাগ আর সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে বিশ্বতালিকায় যুক্ত হয়েছিল শেখ মুজিবের দেশ নামে একটি রাষ্ট্র ‘বাংলাদেশ’। সেই রাষ্ট্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি জনপদ সিলেটের পূর্ব সীমান্তে অবস্থিত হাওর-বাওর, টিলা, আনারস ও কমলাবাগান শোভিত ঐতিহ্যবাহী উপজেলা বিয়ানীবাজার। যার পূর্ব নাম ছিল পঞ্চখণ্ড।

সিলেটের প্রথম রায় বাহাদুর হরে কৃষ্ণ রায় চৌধুরীর পুত্র কৃষ্ণ কিশোর পাল চৌধুরী এখানে একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই সময়ের বাস্তবতায় বিহান বেলা অর্থাৎ সকাল বেলা এই হাট বসতো সেই থেকে বিয়ানীবাজার শব্দটি প্রচলিত। আর যুগে যুগে এই বিয়ানীবাজার নামকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন এই এলাকার সময়ের সাহসী সন্তানেরা। ঐতিহাসিক নানকার কৃষক বিদ্রোহের নেতা কমরেড অজয় ভট্টাচার্য থেকে শুরু করে স্বাধিকার আন্দোলনের বীর শহীদ মনু মিয়া, আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পূর্ণ মানবতাবাদী দার্শনিক শহীদ বুদ্ধিজীবী গোবিন্দ চন্দ দেবসহ মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অনেক বীর শহীদদের রক্তে লেখা একটি নাম ‘বিয়ানীবাজার’।

মুক্তিসংগ্রাম থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, গৌরব আর অর্জনের অংশীদার সুরমা কুশিয়ারার আর সুনাই বেষ্টিত এই জনপদ! এ লেখার বিষয় কিন্তু বিয়ানীবাজার নয়, লিখতে বসেছি একটি স্লোগানের স্মৃতি, একটি মিছিলের স্মৃতি আর কৈশোরের প্রথম প্রহরের স্বপ্নযাত্রার একটি স্মৃতি রোমন্থন করতে।

কৈশোরের প্রথম প্রহরের সে দিন বড় ভাই সিলেট ‘ল’ কলেজের সাবেক জিএস শফিউল আলম চৌধুরী সাগরকে দেখলাম ব্যতিব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে যেতে; তার পিছন পিছন ছুটলাম আমরা দুই ভাই রফিকুল আলম চৌধুরী বাবু ও আমি। আমরা আবিষ্কার করলাম চাচাত ভাই শাহেলুর রেজা চৌধুরীকে নিয়ে একদল তরুণ আর যুবদের মধ্যখানে দাঁড়িয়ে আবেগ আর রাগে অভিমানে, প্রিয় বড় ভাইয়ের কণ্ঠে উচ্চারিত একটি স্লোগান ‘খুনি তোদের রক্ষা নাই, খুন হয়েছে আমার ভাই,আমরা সবাই নাহিদ হব, নাহিদ হত্যার বদলা নিব’। বলাবাহুল্য, যেহেতু আমার জন্ম বিয়ানীবাজার উপজেলার ১নং আলীনগর ইউনিয়নের আলীনগর গ্রামে। সে সুবাদে আমার সম্মুখে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো আলীনগরকেন্দ্রিক।

আমরা দুই ভাই অবলোকন করলাম ক্ষুদ্র এই মিছিলটি আস্তে আস্তে বড় হতে লাগল। বীর মুক্তিযোদ্ধা ও এই অঞ্চলের আওয়ামী লীগের অন্যতম সংগঠক হারুন হেলাল চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধ কালীন একমাত্র হস্ত লিখিত সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘বাংলাদেশ’ সম্পাদক আব্দুল মতিন চৌধুরী, বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সোবহান খান কাঁচা, আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল জলিল, ছাত্রনেতা গোলাম মর্তুজা, আহবাবুর রহমান খান শিশু, ফজল আহমদসহ অনেকের কথাই মনে পড়ছে। মিছিলের পেছনের সারিতে দাঁড়িয়ে অতি উৎসাহী আমরা দুজন আগ্রহ ভরে শুনেছিলাম মিছিল পরবর্তী প্রতিবাদ সভার আলোচনা। তাও পুরোপুরি বুঝতে না পেরে দ্বারস্থ হয়েছিলাম হারুন হেলাল চৌধুরীর। তিনি বললেন- অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে শহীদদের তালিকায় আরেকটি নাম যুক্ত হল।

তারিখটি ছিল ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। তৎকালীন বি.এন.পি সরকারের পাতানো অবৈধ ও প্রহসনের নির্বাচনকে প্রতিহত করতে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ঘোষিত ‘মানুষের ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে’ চারখাইয়ের পল্লীশাসন সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়েছেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সূর্যসেনানি, বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজ ছাত্রলীগ নেতা হুমায়ুন কবির চৌধুরী নাহিদ। যার আত্মত্যাগ বহুধা বিভক্ত আওয়ামী পরিবারকে শুধু ঐক্যবদ্ধ করেনি, করেছিল এক পরিবার। সে সময়ের ছাত্র ও যুবনেতারা সেই শোককে শক্তিতে পরিণত করে যে গণজোয়ার সৃষ্টি করেছেন তা এখনও মুখে মুখে।

সে সময়ের ছাত্র ও যুব নেতাদের মধ্যে হারুনুর রশীদ দিপু, ছাত্রনেতা আব্দুল বারী, বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের তৎকালীন ভিপি সারোয়ার আহমদ, দেওয়ান মাকসুদুল ইসলাম আউয়াল, টিটু আহমদ, জেবুল আহমদ, আব্বাছ উদ্দিন প্রমুখ আন্দোলন সফলে জোরালো ভূমিকা রেখেছিলেন বলেই পরবর্তীতে তার ফসল ঘরে তুলেছিল আওয়ামী লীগ।

ভাবতে কষ্ট হয় ১৫ ফেব্রুয়ারি না আসলে অনেকে স্মরণই করেন না আমার প্রথম মিছিলের প্রেরণা হয়ে থাকা শহীদ নাহিদকে। আজকে অগ্রজ একসময়ের তুখোড় ছাত্রনেতা আমেরিকা প্রবাসী সারোয়ার ভাই আর আমি সেই দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে কেবল হতাশ হইনি বরং হয়েছি বাকরুদ্ধ। মনে কেবল একটি অপরাধ বোধ নূর হোসেন, আসাদ, মিলন, ওয়াজিল্লাহ আর শহীদ নাহিদদের রক্তের সাথে আমরা আপোষ করছি না তো?

রুহুল আলম চৌধুরী উজ্জ্বল: চেয়ারম্যান, হৃদয়ে-৭১ ফাউন্ডেশন।